দখিনা-দুয়ার 

তীর্থ-ত্রিমাত্রিক

মি যেতে চাইনি। আমি যেতে চেয়েছি।
আমি গিয়েছি।

পরিণতিটাই তো চুড়ান্ত সত্য। যা ঘটল শেষ পর্যন্ত ।
'হতে পারতো, হওয়ার কথা ছিল..' ওসব তো ব্যাবহৃত টিস্যুপেপারের মত ফাঁপা নিঃশ্বাস মাত্র । কতো কথা,কতো কথা দেয়া, আরো কতো কথা নেয়া।

তারপর...?
জীবন দাস কবি। থাকে শুধু অন্ধকার!
যে বৃক্ষের ছায়ায় আমরা পাঁজর বদলে নিতাম পরস্পর - তার ডালপালা ক্রমশ: মৃয়মান। মাঝে মাঝে নিজেকে শকুনের মত মনে হয়। এক এক করে প্রত্যেকে পাড়ি জমাচ্ছে পাউন্ড ডলারের স্বর্গে। আমি একা এক হরিদাস পাল আটকে আছি এই মৃত ভাগাড়ে।

সেদিন চামেলীকে দেখলাম। মেয়ে নেই আর। মাশাল্লাহ মহিলা হয়ে গেছে গায়ে গতরে । সোনাদানা গায়ে লেপ্টে রিকশায় ঘোমটা তুলে যাচ্ছে কোথাও। পাশে এক মাঝ বয়সী মধ্যশ্রেনীর লোক। নিশ্চয় ওর স্বামী । চামেলীর বিয়েতে আমরা গিয়েছিলাম। লোকটার চেহারা আমার মনে নেই। আচ্ছা, বিয়ের পর লোকজন বউকে নিয়ে ঘোরার সময় রিক্সার ঘোমটা তোলে কেন?
বিবাহিত জীবনের অশ্লীলতা গুলো আরো বেশী আড়াল করার জন্য?

এই চামেলীকে তুমি একদিন ভয়াবহ রকম সতর্ক করে দিয়েছিলে যেন আমার কাছ না ঘেঁষে। এই নিয়ে ক্লাশে কত হাংগামা। আর সেই প্রথম আমি জেনেছিলাম চামেলী আমার কাছ ঘেঁষতে চেয়েছিল, যে চামেলী এখন ভয়াবহ রকম ভাবে মহিলায় রূপান্তরিত। সেই প্রথম আমি জেনেছিলাম তুমি আমাকে ভালোবাসো, সে তুমি এখন?... ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মতো ফাঁপা দীর্ঘ নি:শাস।

আর আমি তখন ভূগছি গোপন অসুখে। বোধের এবং বুননের।
ক্লাশের শেষ ডেস্কে বসে 'টুফাইভ’ সিগারেটের ফাঁপা শরীরে ঢোকাই মোহিনী গুঁড়ো , টান দিয়ে ধোঁয়ার ভেতরে কেউ দেখে মেয়েদের ড্রেস করা মাংসের প্যাকেট আর আমি ধরি বাতাস থেকে মোহময় শব্দ । শব্দ দিয়ে বাক্য গাঁথি:
‘নোঙ্গর তুলে নিলে নরোম মাটির বুকে থেকে যায় দাগ
মাটি না নোঙ্গর কার বুকে জন্মায় এত অনুরাগ ?'

আমি আমার বুকে এই দগদগে দাগের অস্তিত্ব টের পেলাম যেদিন বুক থেকে নোঙ্গর উঠে গেল তুমুল আনুষ্ঠানিকতায়।
এর আগে টের পাইনি আমি। একদিনও না।
কেননা এর আগেই ভেঙ্গে পড়েছে বার্লিনের দেয়াল, মহামতি লেনিনের উঁচিয়ে ধরা তর্জনী ভূ-পাতিত, সমাজতন্ত্রীদের যৌনক্রিয়ায় ব্যাপক তৃপ্তি দিচ্ছে ইউনাইটেড স্টেটস অফ ভয়ংকর আমেরিকার কার্যকর ভায়াগ্রা ।
আর তারো আগে প্রথম কৈশোরেই কি করে যেন আমার জানা হয়ে গিয়েছিল সাম্যবাদ আর পুঁজিবাদের মধ্যে যুদ্ধ যদি বন্ধ হয়ে যায়, যদি ভালোবাসা আর ঘৃণার আর ভিন্ন মানে না থাকে-- তাহলে মানুষ আর মানুষের বুকে গড়বেনা স্থায়ী নিবাস। পৃথিবীর সকল ধার্মিকেরা ধর্ম বাদ দিয়ে পুজারী হবে কেবল পুঁজির। পুরুষেরা চাকরীর নামে দাস হবে আর বিবাহের নামে মেয়েরা হবে যৌনদাসী।
আর মানুষ ইতিহাসের পরিণতি বলেই-লেনিন ভেঙ্গে পড়লে এক হরিদাস পাল কবির প্রেমিকাকে বিয়ে করে নিয়ে যায় বিদেশী বণিক।
পরিণতি জানা তবু প্রতিক্রিয়া এত অদ্ভূত হলো কেন?

ভালোবাসার উষ্ণ দিন গুলোতে যে তুমি আসোনি কখনো আমার শব্দে কিংবা বাক্যে , বিরহের শীতলতায় সে তোমার কেন এত তীব্র উপস্থিতি? আর এ কি বিরহ! প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাহীন প্রস্থান কি কোনই অর্থ বহন করে আদৌ ? এই অনর্থ যখন বিরাট অর্থবহ হয়ে দাড়ায়, তখন এর কোনো মানে হয়?

‘জোছনার অন্ধকারে আমি এক অন্ধ তীরন্দাজ’
'জোছনার অন্ধকার’ মানে কি? অন্ধ হলে তীরন্দাজ হয় কি করে?
-এই সব মোহক শব্দগুচ্ছের মানে খুঁজতে সুমনা যখন আমার খুব বুক ঘেষে, আর আমারো রক্তে জাগছে শিকারের নেশা, তখন তুমি কেন প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে হ্যামারিং শুরু করেছিলে? কি মানে ছিল আমার এই স্বপীড়নের যখন তুমি উষ্ণতা বিলাচ্ছো অন্য কোন বিছানায়?

প্রতিটি অবিবাহিত পুরুষের নিজস্ব কিছু গোপন আনন্দ থাকে । মধ্যরাতের নির্ঘুম ফ্যান্টাসীতে নিরাভরন হয়ে উঠে আসে সুমনা, তানিয়া অথবা রাস্তায় দেখা আঁটোসাটো জামার অচেনা মেয়েটা।
আমি প্রবল ভাবে চাই, তোমাকে চাই আমার নিরাভরণ কল্পনায়। একজন হৃদয়বান পুরুষের স্বর্গ তো ওখানে। ওই স্বর্গে তোমার সাথে চুড়ান্ত মিলিত হয়ে তোমাকে ক্ষমা করে আমি বেঁচে যেতে চাই।

সত্যি আমার তাই মনে হয়।
তুমি নেই কিন্তু তোমার উপস্থিতি আমাকে প্রবল ভোগায়।
আমার ইচ্ছে হয় নিজের কাছে প্রমান করে দিতে - তুমি আলাদা কেউ নয়।
কিন্তু কি আশ্চর্য আমি আমার কল্পনায় ও বন্দী তোমার কাছে। যুক্তি ও বোধের এই প্রবল বৈপরীত্য আমাকে ক্রমশ: অসহায়, বিরক্ত, ক্রুদ্ধ করে তুলছিল।
তোমার কাছ থেকে মুক্তি পাওয়াটা খুব জরুরী ছিল।

আর তাই!
আমি গিয়েছিলাম।
তার কাছে। তাদের একজনের কাছে। হাজার বছর ধরে যারা পুরুষের নিরূপায় অশ্লীলতাকে বরণ করেছে পুঁজির মূল্যে
মেয়েটা খুব উষ্ণ ছিল। মেয়েটা খুব কৌশলী ছিল। সে আমার সবটুকু নিংড়ে নিয়েছিল। সেই আমার প্রথম ছিল।
এবং সে আমাকে মুক্তি দিয়েছিল অর্থহীন আবেগ, নিস্ফল ভালবাসার ফাঁদ থেকে।

এখন রোজ রাতে অন্য সকলের মতো তুমিও উষ্ণতা বিলাও আমার বিলাসী অশ্লীলতায়।
 

হাসান মোরশেদ

  দখিনা-দুয়ার