আরও একটি বছর পার হয়ে গেলো কিংবা নতুন একটি
বছর এলো । পৌঁণপুণিকতার এ ধারায় সময়ের ছুটে চলা । পলাতক সময়। বছরের শেষে এসে সবাই
ফিরে তাকায় বিগত বারো মাসের বারোয়ারি ভাগ-বাটোয়ারায় । পাওয়া না পাওয়ার সমীকরণে
আগামী বছরের প্রত্যাশার ভাবনাও জড়ো হয় । ক্যালেন্ডারের এই হিসেবটাই যেন আগামী দিনকে
বাঁচিয়ে রাখে , স্বপ্নকে লালন করে। বাংলা সনের খতিয়ানে ব্যবসায়িক হালখাতার অন্য রূপ
ব্যক্তি-মনে ঠাঁই করে নেয় । সেটাও আয়-দায়ের নিক্তি কাঠামোর বাইরে নয় ।
অদৃষ্টে বিশ্বাসীদের অনেকেই রাশিফলের বই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে । কেমন যাবে নতুন বছর
; অর্থপ্রাপ্তি , স্বাস্থ্য , প্রেম-বিরহ-বিয়ে-রোমান্স , বিদেশ ভ্রমণ কিংবা
পদোন্নতি । সাপ্তাহিক কিংবা পাক্ষিকগুলো ঢাউস আকারের রাশিফল সংখ্যা বের করে ।
রাশিভিত্তিক ভাগ্য গণনা, নারী-পুরুষ বিশেষে গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান কিংবা নামের
অদ্যাক্ষর দিয়ে নতুন বছরের ভাগ্য যাচাই চলে হরদম । সাথে যোগ হয় সেলিব্রিটিদের
ভবিষ্যৎ বয়ান । নানান আপদ বিপদের ফাঁড়া কাটাতে পাথর নেয়ার পরামর্শও দেয়া হয় ।
দেশভিত্তিক রাশিফল আলাপও করে কেউ কেউ। দেশের ভাগ্য গণনায় বেশির ভাগ দেখা যায়
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দূর্যোগ হবে, ভারতে রেল দূর্ঘটনা ঘটবে, পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনীতে বিদ্রোহ দেখা দিবে - এরকম অনুমান ভিত্তিক ভবিষ্যৎবাণী। দেশের জনপ্রিয় একটি
সাপ্তাহিকের রাশিফল সংখ্যা কিনেছিলাম পরপর তিন বছর । মজার ব্যাপার হলো - তিন বছরে
রাশিফল সংখ্যার সম্পাদকীয়ের ভাষা একই রকম - "রাশিফলের বিজ্ঞান ভিত্তিক কোনো
ব্যাখ্যা আছে কিনা আমরা জানি না । কোনো ব্যাখ্যা দেয়ায় আমাদের আগ্রহ নেই। অনেকেই
প্রবলভাবে রাশিফলে বিশ্বাস করেন, আবার কেউ কেউ বিশ্বাস না করলেও আড়চোখে রাশিফল পড়ে
নেন আগ্রহে । এরকম পাঠকের বিশাল অংশের চাহিদার দিকে লক্ষ্য করে এবারও আমরা রাশিফল
সংখ্যা প্রকাশ করছি । আশা করছি সংখ্যাটি সারা বছর আপনার সংগী হিসেবে থাকবে ।"
২০০৭ সালের রাশিফলে "মা সুফিয়া খাতুন"এর চ্যালেঞ্জ ছিল - খালেদা জিয়া আবারও
প্রধানমন্ত্রী হবেন , আর সর্পরাজ এসএম শাহ ১০০% গ্যারান্টী দিয়ে বলেছিল -
টু-থার্ড মেজরিটি নিয়ে শেখ হাসিনাই প্রাইম মিনিস্টার । সুফিয়া-শাহ' দের
নেটওয়ার্ক ফ্রিকোয়েন্সীতে মাসুদ-মঈনুল-ফখরুদ্দিন ধরা পড়েনি । তবে নিশ্চিত এবারের
রাশিফলে এদেরই কেউ কেউ ফলাও করে বলবে - "বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওয়ান ইলেভেন ,
হাসিনা-খালেদা-তারেকের হাজত বাস, বেনেজিরের মৃত্যূ নিয়ে একমাত্র ভবিষ্যৎবাণী
করেছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন জ্যোতিষি রাজ প্রফেসর হাবিলদার ।"
এসব ভূত-ভবিষ্যতের পরোয়া না করে বাংলাদেশ এবার পার করেছে ভয়াবহ সিডর, চট্রগ্রাম
ভূমিকম্প। মাইনাস টু, প্লাস থ্রি' র রাজনৈতিক টানাপড়েন, বাংলাভাই-শায়খুলের ফাঁসি,
ক্রিকেটের কিছু স্মরণীয় জয়, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের দেশে ফেরা, দূর্নীতির রং-বাহারী
বস্ত্রহরণ, নানান জবানবন্দীর অডিও, গোপন কথা গোপন ছবি কিংবা গপ্পোগুজবে কঠিন শাসনের
ছায়া । এ ছায়ার আগুনে আক্রান্ত কার্টুনিস্ট আরিফ । দেশের প্রধান দৈনিকগুলো বছরের
প্রথম দিনে আলোচিত দশ চরিত্র নিয়ে ক্যারিকেচার করেছে, বিশ্লেষণ করেছে । রাজনীতি আর
মসনদের রুই-কাতলাদের সাথে বিনোদন আশরাফুল-সাবিনা ইয়াসমিন সাথী হয়েছে । কেবল আরিফ
নেই, কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমান নেই। ধর্মীয় মৌলবাদের এ আগ্রাসন গত বছরে যে শংকা
জাগিয়েছে তা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় বিবেকদের কাউকে দেখা যায়নি । বরং সাজগোজ করে দল
বেঁধে হাত জোড় করে অবনত হয়েছে এ অপশক্তির কাছে । কোথাও আলো নেই।
নির্বাচন হবে কি হবে না, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নাগালে আসবে কিনা এসবের
সমাধানহীন প্রশ্নে নতুন বছরে কেমন থাকবে বাংলাদেশ ? অনিশ্চয়তার এ
প্রশ্ন করতেই সাত্তার মামা একটি গল্প শুনিয়ে পাশ কাটিয়ে গেলেন:
" এক পরিবারে অদ্ভুত এক শিশুর জন্ম হলো।
প্রথম দিনে শিশুটি ভীষণ হাসিখুশি।
তবে পরদিন শিশুটি হঠাৎ 'মা- মা - মা ' বলে কান্না শুরু করলো । ঐদিনই শিশুটির মা
মারা গেলো ।
পরদিন সকালে শিশু কান্না শুরু করলো - "নানা, নানা, নানা"। বিকেলে মারা গেলো নানা ।
শুরু হলো আতংক।
শিশুর কান্নার মাঝে এবার "মামা, মামা, মামা"। পরিণতিতে মামা মারা গেলো পরের বেলায়।
আতংক চরমে। সবার নজর শিশুর বাবার ওপর। এবার শিশুটি সত্যি সত্যি "বাবা বাবা বাবা"
বলে কান্না শুরু করলো ।
বিকেলে মারা গেলো পাশের বাসার ভদ্রলোক।"