ভাবনা-দুয়ার 

স্যরি, শর্মিলা বোস, আনএ্যাকসেপ্টেড

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পলিটিকাল ইকনমিতে পিএইচডি করা ড. শর্মিলা বোস যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যু্দ্ধের ব্যাপারে উৎসাহিত হয়ে রিসার্চ পেপার লেখেন, তখন সেটা পড়তে আগ্রহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তারওপর যখন শোনা যায় যে পেপারটা কনভেনশনাল আইডিয়াগুলোকে চ্যালেঞ্জ করেছে, তখন মানুষ মাত্রেই জানার কৌতুহলটা জন্মাবে যে তিনি কি লিখেছেন। সেইসূত্রেই তাঁর পেপারটা পড়া, যেটার শিরোনামটা বেশ বড়,
Losing the Victims: Problems of Using Women as Weapons in Recounting the Bangladesh War
(পেপারটির কোন ইন্টারনেট লিংক খুঁজে পেলামনা, আমার কাছে পিডিএফ কপি আছে, চাইলে মেইল করতে পারি)।
এককথায়, পেপারটা পড়ে আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। কেন? কারণ আগেই শুনেছিলাম এতে দাবী করা হয়েছিল যে ১৯৭১ এ বাংলাদেশে পাকিস্তানী বর্বর আক্রমণ "অপারেশন সার্চলাইটে" ২ লাখের বেশী নারী ধর্ষিত হয়েছেন বলে যে ধারনাটা করা হয়, সেটা বিরাট অতিরঞ্জনে অভিযুক্ত। প্রফেসর বোস নাকি দাবী করেছেন যে সংখ্যাটা অনেক অনেক কম, কয়েক হাজারের বেশী হবেনা। সেজন্যই খুব ভয়ে ভয়ে পেপারটা পড়া শুরু করি, এত বড় প্রফেসর, তার ওপর এত সরাসরি তিনি উপসংহার টেনে ফেলেছেন, না জানি কি অকাট্য প্রমাণ দেখিয়েছেন। তো, মনটা ভাল হয়ে গেল সেজন্যই যে, এমন কোন অকাট্য প্রমাণ তো দূরের কথা যুক্তিও দেখলামনা। সত্যি বলতে কি, মাত্র সাত বছরের গবেষণার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই আমার মুখ থেকে শুনতে খুব "ছোটমুখে বড় কথা" ধরনের শোনালেও, এটা বলতেই হচ্ছে যে প্রফেসর বোসের এই রিসার্চওয়ার্কটা কোন রিসার্চের পর্যায়েই পড়েনা। কেন সেটা পয়েন্ট বাই পয়েন্ট ভেঙে ভেঙে আলোচনা করব এখানে।

প্রথমেই একটু "অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও হতে পারে" কথাটুকু বলে নিই। বিজ্ঞান বা শাস্ত্রকে আজকাল যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হচ্ছে। এ-ফোর সাইজের কাগজে মোটা মোটা দুকলামে ছোট ছোট অক্ষরে ৫/৬ টা চ্যাপ্টারে ভাগ করে একটা প্রবন্ধ লিখেই মানুষ সেটাকে রিসার্চ পেপার হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে। একটা সাধারণ কথাকেও একাডেমিক ফ্লেভার দিয়ে চালিয়ে দেবার জালিয়াতিটা একাডেমিয়াতে বেশ আগে থেকেই শুরু হয়েছে। সিরিয়াস রিসার্চাররা ধারনা করেন, এক্সিস্টিং জার্নালগুলোতে যে পরিমাণ পেপার প্রকাশিত হয়, তার শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগই কোন রিসার্চ ওয়ার্কই না। আমি নিজেও কিছু পেপার রিভিউ করেছি, এবং কথাটা যে কি পরিমাণ সত্য সেটা গভীরে না ঢুকলে বোঝা যায়না। অথচ একটা পেপারে যখন এরকম "হাইলি একাডেমিক" ফ্লেভার লেগে যায়, তখন লোকে দেদারসে সেটাকে রিফার করা শুরু করে, আর অধিকাংশ মানুষই লেখাটার "হাইলি একাডেমিক" চেহারা দেখে সেখানেই ভেবে নেয় যা লিখেছে নিশ্চয়ই সত্যিই হবে। গবেষণা বিশ্বের ঠিক এই দূর্বলতাকে ব্যবহার করে যাচ্ছে নানান পদের মানুষ, যেখানে সেখানে, যখন তখন -- একটু ভেবেও দেখছেনা খটকা লাগে কিনা। ভাবটা এমন যে, এরকম পেপারের ফর্মায় প্রকাশিত যাবতীয় লেখাই সত্য। অথচ, সত্যি বলতে শতকরা ৯০ ভাগের বেশীর তো প্রয়োজনই নেই, আর সেই ৯০ ভাগের একটা বিশাল অংশ হলো স্রেফ আবর্জনা।

তবে ড. শর্মিলা বোসের এই পেপারটা নিয়ে একটা মজার রিভার্স ইফেক্ট টাইপের ব্যাপার ঘটেছে বাংলাদেশে। ড. বোস পরিস্কারভাবেই এই পেপারে পাকিস্তানী হানাদারদের ব্যাপারে সাফাই গেয়েছেন, বোঝাতে চেয়েছেন যে তারা যুদ্ধ করেছে, যুদ্ধে সাধারণত যেটুকু ক্ষয়ক্ষতি হয় সেটাই হয়েছে, সিস্টেমেটিকালি কোন ক্ষতি করেনি যেটাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশে এই বক্তব্যকে একেবারে লুফে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরবে জামাত ইসলামী, যেটা কেবল একটিমাত্র সংগঠন এদেশে যেখানে এখনও যুদ্ধাপরাধীরা একত্র হয়ে আছে, এবং যেখানে তারা এখনও সেই ৭১ এর ব্যাপারে কোন ছাড় দেয়না। এই আচরণ দিয়ে তারাই একমাত্র দল যারা এখনও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানপন্থী বাংলাদেশীদের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছে সমষ্টিগতভাবে। কিন্তু, ড. বোসের কপাল খারাপ আর আমাদের কপাল ভাল যে, তাঁর নামটা পড়েই জামাতীরা আর পেপারটা উল্টেও দেখবেনা, যেটা দেশের ভেতর আরো কিছু কন্সপিরেসীকে স্বাভাবিকভাবেই কমিয়ে দিয়েছে।

সূচনাটা বিশাল হয়েই গেল, কিছু করার নেই, পেপারের সমালোচনা লিখতে বসে কিছুটা আবেগপ্রবন হয়ে পড়েছিই, যেহেতু নিজ দেশের ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচার টের পেয়েছি। নীচে একটা একটা করে কারণ দেখাবো, কেন প্রফেসর বোসের পেপার হওয়া সত্বেও রিভিউয়ার হিসেবে এটাকে আমি গ্রহন করবনা।

১. ত্রুটিপূর্ণ উপাত্ত সংগ্রহপদ্ধতি
প্রফেসর বোস তাঁর গবেষণাকাজে কিছু ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ভাসাভাসাভাবে দেখলে, একদম সঠিক পদ্ধতি। কিন্তু একটু গভীরে ঢুকে দেখলেই দেখা যাবে,
বাংলাদেশের মানুষদের সাক্ষাৎকারকে তিনি তার রিসার্চের কোন উপসংহারের সাপোর্টে ব্যবহার করেননি। এমনকি বাংলাদেশের কোথায় কোথায় কতজনের সাক্ষাৎকার তিনি নিয়েছেন সেনিয়ে কোন তথ্যও নেই! শুধু একটা জায়গাতেই তিনি তাঁর বাংলাদেশে সংগঠিত সার্ভের কথা বলেছেন, যেখানে তিনি দাবী করেছেন যে মানুষ ধর্ষনের কথা বলতে আগ্রহী না। অথচ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজনের বক্তব্য তিনি নিয়েছেন, তাঁদের নামও তুলে দিয়েছেন, তাঁদের উক্তিও তুলে দিয়েছেন। বোঝা যায়, পাকিস্তানী সাক্ষীদের বেলা তিনি খুব সিস্টেমেটিক উপায়ে গবেষণার উপাত্ত জোগাড় ও প্রকাশ করেছেন। অথচ, ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে, ঘটনার শিকার বাংলাদেশী সাধারণ মানুষ, ঘটনার অভিযুক্ত পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। একজন পলিটিকাল ইকনমির প্রফেসরকে যদি এরপরও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় যে, "তোমার গবেষণার জন্য তুমি এই সাবজেক্টদের কাছ থেকে যতবেশী পার তথ্য জোগাড় করো", তাহলে তার গবেষনাকে আমি কিভাবে অনুমোদন করব?
২. ত্রুটিপূর্ণ সূত্র-ব্যবহার পদ্ধতি
প্রফেসর বোস বেশ কিছু ডকুমেন্টও ব্যবহার করেছেন তাঁর গবেষণায়, তবে এখানেও তাঁকে পরিষ্কার পোলারাইজড হতে দেখা গেছে। কেন? তিনি ডকুমেন্টগুলোকে দুটো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন -- প্রথমটা হলো তিনি তাঁর বক্তব্যের সাপোর্ট হিসেবে কিছু ডকুমেন্টকে উদ্ধৃত করেছেন, আর কিছু ডকুমেন্টের বক্তব্যকে তিনি সমালোচনা করেছেন। এখানেও দেখা যায় তিনি হামুদুর রহমান কমিশনের বক্তব্যকে সাপোর্টিং ডকুমেন্ট হিসেবে নিলেন, অথচ ব্রাউনমিলার ও নয়নিকা মুখার্জির সুলিখিত আর্টিকেলের কিছু বক্তব্যের সমালোচনা করলেন। হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট হলো ৭০ এর দশকে সামরিক শাসক নিয়োজিত সরকারী এক কমিশনের বক্তব্য, যেটার বিশ্বাসযোগ্যতার দূর্বলতা নিয়ে পলিটিকাল ইকনমির প্রফেসরের অজ্ঞতা থাকার কথা না। আচ্ছা, তিনি ব্রাউনমিলার আর মুখার্জির পেপারের সমালোচনা করেছেন, ভালো কথা, কিন্তু একাডেমিক কোন পেপারই কি তিনি পেলেননা যেটাকে তিনি তাঁর গবেষণার কাজে সাপোর্টিং ডকুমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে পারতেন? তাঁকে যেতে হলো হামুদুর রহমান কমিশনের বক্তব্যের কাছে? আমার সোশিও-পলিটিকাল জ্ঞান খুবই সামান্য, তাও সেটা দিয়েই এই পেপারকে আমি নাকচ করে দেব, কারণ হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট যে একটা করাপ্টেড দূর্বল রিপোর্ট হবে এটা বোঝার জন্য রকেট-সায়েন্টিস্ট হবার দরকার নেই। কোন প্রতিষ্ঠিত জার্নাল/সংবাদপত্রের সূত্র না দিতে পেরে তিনি আমাদেরকে গিলতে বলছেন পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র, দেখুন তিনি লিখেছেন,
"The government of Pakistan’s White Paper on East Pakistan in August 1971 listed numerous incidents of atrocities including alleged rape and massacre of non-Bengalis by Bengalis all over East Pakistan"
এরচেয়ে হাস্যকর আর কি হতে পারে?

৩. সুষ্পষ্ট মিথ্যাচার
প্রফেসর বোসের এই গবেষণা প্রবন্ধে বেশ কিছু মিথ্যে তথ্য পরিবেশিত হয়েছে, তবে খুব চাতুর্যের সাথে। তিনি তথ্য পরিবেশন করেছেন সূত্র দিয়ে, কিন্তু সেটা সর্বজনবিদিত সূত্রগুলো এড়িয়ে। মিথ্যে তথ্যটি তিনি পরিবেশন করেছেন ৭১ এ বাংলাদেশে "অপারেশন সার্চলাইটে" নিয়োজিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা নিয়ে। যেখানে সুলিখিত সব সূত্রে এই সংখ্যাকে ৯০ হাজারের উপরে বলে ধারনা করা হয়েছে, সেখানে তিনি সেটাকে ৩৪ হাজারের বেশী মানতে রাজী নন। সেজন্য তিনি বরাত দিয়েছেন তৎকালীন সিআইএ চীফের ৬ মার্চ আর ২৬শে মার্চ মিটিঙে করা মন্তব্যকে, যেখানে একটা সাধারণ ধারনা প্রকাশ করেছেন সিআইএ চীফ। ড. বোস কি আর কোন সূত্র পেলেননা? অফিশিয়াল বন্দীর সংখ্যা যেখানে ৯০ হাজারের বেশী, অধিকাংশ সূত্রই যেখানে নিয়াজীর বাহিনীকে ৯৩ হাজার সৈন্যসমৃদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করেছে, সেখানে প্রফেসর বোস খুব সুকৌশলে সংখ্যাটিকে ৩০ হাজারের কাছাকাছি রাখতে চান। এখানে যে ব্যাপারটা খেয়াল করতে হবে তা হলো, তিনি এই সংখ্যাটিকে শুধু ইতিহাস বর্ণনার খাতিরে উল্লেখ করেছেন, তা কিন্তু নয়। সুষ্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এ মিথ্যাচারটি এই প্রবন্ধে হয়েছে, এবং সেই উদ্দেশ্যটি হলো তাঁর মূল বক্তব্যের জন্য একটি সংখ্যাতাত্বিক ব্যাখ্যা, যেখানে তিনি দাবী করেন যে ৭১ এ পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের বাঙালী সহযোগী বাহিনী, যেমন রাজাকার, আলবদর, শান্তি কমিটি ও অন্যান্য -- এদের দ্বারা সংঘটিত ধর্ষনের সংখ্যা কয়েক হাজার মাত্র। পাকবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৩৪ হাজার ও তাদের সহযোগী বাঙালীর সংখ্যা ১০ হাজারের মতো ধরে নিয়ে তিনি দাবী করেন,
"Most commentators on sexual violence in East Pakistan do not appear to realise how small a force was attempting to put down a rebellion in a province with a population larger than all the other provinces in West Pakistan put together"। অথচ, সংখ্যাতাত্বিক বাস্তবতা বলে, ৯০ হাজারের বেশী পাক হানাদার আর অগুনতি রাজাকার ও অন্যান্য সহযোগীরা মিলে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালীদের উপর ২ লাখের বেশী ধর্ষণ করার কথা।

প্রফেসর বোসের পরবর্তি মিথ্যাচারটি আরো হাস্যকর। এখানে তিনি তাঁর সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন হামুদুর রহমান কমিশনের বক্তব্য,
Hamoodur Rahman Commission’s article says, “The falsity of Sheikh Mujibur Rahman’s repeated allegation that the Pakistani troops had raped 2,00,000 Bengali girls in 1971 was borne out when the abortion team he had commissioned from Britain in early 1972 found that its workload involved the termination of only a hundred or more pregnancies”
অথচ বাস্তবতা হলো, তৎকালীন বাংলাদেশে যে ব্রিটিশ, আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তারদের দল এ্যাবরশনের কাজ পরিচালনা করেন তাদের সদস্য, আইপিপিএফ চেয়ারম্যান ওডার্ট ভন শুলজ, ড. জিওফ্রে ডেভিস ও অন্যান্যদের বক্তব্য তঃেকে জানা যায় যে শুধু ঢাকার ক্লিনিকগুলোতেই ২৩ হাজার এ্যাবরশন সম্পাদিত হয়। এই সংখ্যাকে হামুদুর রহমান কমিশনের মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে কয়েকশ' হিসেবে ঘোষনা করে প্রফেসর বোস কাদের পক্ষে কথা বলতে চাইছেন? যুদ্ধে নিগৃহিত নারীদের পক্ষে? নাকি, যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী হানাদারদের পক্ষে?

৪. পরোক্ষ মিথ্যাচার
প্রফেসর বোসের এই লেখায় প্রত্যক্ষ মিথ্যাচারের সাথে সাথে কিছু পরোক্ষ মিথ্যাচারও চলে এসেছে। এখানে পরোক্ষ মিথ্যাচার বলতে বোঝানো হয়েছে যে, লেখাটি পড়ে পাঠকের অনুমান একটি মিথ্যের দিকে চলে যাবে। যেমন তিনি বলেছেন,
"The rebellion in then East Pakistan (populated mostly by Bengalis) resulted in war between those who wanted to secede to form the independent country of Bangladesh and those who wished to preserve a united Pakistan. There were Bengalis on both sides of this political divide. Many Bengali members of the armed forces or police defected to the rebel cause, but others remained loyal to Pakistan."
এখানে তিনি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের মূলফ্রন্ট জামাত ইসলামি বাংলাদেশের বক্তব্যের পূর্ণ প্রতিফলন করলেন। এই একটি বাক্যের মাধ্যমে তিনি পরোক্ষভাবে ৭১ এর প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার পক্ষ আর বিপক্ষ শক্তিকে প্রায় সমান বা কাছাকাছি সংখ্যার বলে পরিবেশন করলেন, যেটা থেকে যুদ্ধটাকে দেশের দুটো রাজনৈতিক ফ্রন্টের মাঝে গৃহযুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করার একটা প্রয়াস যে কেউ পেতে পারে। তদুপরি, উপরের বক্তব্যে তৎকালীন পূর্ব বাংলার জনগনের মতামতের প্রতিফলনও ঘটেনা।

প্রবন্ধের আরেকটি জায়গায় তিনি যুদ্ধে ধর্ষিতা নারীদের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন,
"The available material shows that the victims of rape were Hindu and Muslim, Bengali, Bihari and West Pakistani" -- যেখানে তিনি সব ভিকটিমকে এককাতারে ফেলে দিয়েছেন। যদিও বিহারী হোক বা পাকিস্তানী হোক আর বাঙালী হোক, ধর্ষণ সমানমাত্রার অপরাধ, কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে বক্তব্যটি পড়লে মনে হবে যে ৭১ এ সবপক্ষই সবপক্ষকে "কমবেশী" নির্যাতন করেছে, যেটা তিনি সুচতুরভাবে পাঠকের মনে প্রোথিত করতে চেয়েছেন। এরকম পরোক্ষ মিথ্যাচার কোনভাবেই প্রত্যক্ষ মিথ্যাচারের চেয়ে কম ক্ষতিকর নয়।

**********************************************************
**********************************************************

এপর্যন্ত যে চারটি দিক আলোচনা করা হয়েছে তাতে প্রফেসর বোসের ভুলগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হয়েছে। অবশ্যই যেকোন বিষয়েই একজন গবেষক গবেষণাকাজ (পরীক্ষণ, নিরিক্ষণ বা তথ্যসংগ্রহ যেটাই হোক ) শুরু করার আগেই একটি ধারনা মনের মধ্যে পুষে রাখেন, এবং তাঁর সকল ব্যাখ্যাকে তিনি সেই ধারনার দিকে নিয়ে যেতেই পছন্দ করেন। তবে এক্ষেত্রে প্রফেসর বোসের মতো জ্ঞানী ব্যাক্তির মনোভাবকে সেরকম নির্দোষ গবেষকের ভুল হিসেবে গ্রহনের চেয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ধারণা করাই সবাস্টবসম্মত বলে মনে করি। তবে প্রফেসর বোস শুধু প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ মিথ্যাচার বা দূর্বল সূত্রের আশ্রয়ই নেননি, তাঁর বেশকিছু যুক্তি খুবই দূর্বল মনে হয়েছে। তদুপরি বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য পড়ে মনে হয়েছে তিনি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত নন। পরবর্তী পয়েন্টগুলোতে সেবিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব।

ড. বোস তাঁর প্রবন্ধে পাঁচজন বাংলাদেশী প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ব্যবহার করেছেন, পাঁচটি বিবরণকে দূর্বল হিসেবে দেখিয়ে তিনি উপসংহার টেনে ফেললেন যে এঁদের সবার বক্তব্যই মিথ্যে। এবং গায়ের জোরে এই পাঁচটি বক্তব্যকে মিথ্যে হিসেবে দেখিয়ে তিনি দাবী করে ফেললেন যে রেপভিকটিমের সংখ্যা ২ লাখ তো নয়ই বরং কয়েক হাজার মাত্র!
ঠিক কোন লজিকে পাঁচটি মাত্র বিবরণকে দুর্বল হিসেবে (তাও গায়ের জোরে, এই লেখারই পরবর্তী অংশে সে বইষয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে) দেখিয়ে একজন এরকম একটি বিশাল ঘটনার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেন সেটা দূর্বোধ্য।

যে যুক্তিগুলো দিয়ে তিনি পাঁচটি বক্তব্যকে খন্ডন করতে বা দূর্বল হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন, সেই যুক্তিগুলো এখানে আলোচনা করব। পাঠকমাত্রেই বুঝতে পারবেন, এধরনের যুক্তি আদালতে বাজে উকিলরা ব্যবহার করেন সাক্ষ্যদাতা/বাদী/বিবাদীকে মানসিকভাবে দূর্বল করে দিতে; এধরনের যুক্তি একাডেমিয়াতে ব্যবহার করলে সেটা শুধু দুর্গন্ধই ছড়াবে।

৫. রাবেয়া খাতুনের বক্তব্যের সাপেক্ষে দুর্বল যুক্তি
প্রথমজন, রাবেয়া খাতুনের বক্তব্যের ব্যাপারে তিনি লিখেছেন,
"I asked an eminent Bangladeshi and a strong supporter of the liberation movement to read this account and tell me what he made of it. He opined that it was a “fabrication”, commenting that the parts about women hanging by their hair from iron rods for days on end “defied the laws of science”.
Being a busy police headquarters in the capital city, whatever happened at Rajarbag would have had many witnesses.
The language is not what would be used either by illiterate sweepers or by educated Bengalis in everyday conversation."

রাবেয়া খাতুন তাঁর সাক্ষ্যে রাজারবাগ পুলিশ কম্পাউন্ডে সংঘটিত নারী নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিয়েছেন, যেখানে তিনি বলেছেন যে কলেজপড়ুয়া বা গৃহবধু ধরনের মেয়েদের ধরে নিয়ে আসা হতো, ধর্ষণ করা হতো এবং দিনের বেলা তাদেরকে বারান্দার রেলিঙে চুল বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হতো। অন্য দুজন প্রত্যক্ষদর্শীও একই বক্তব্য দিয়েছেন। প্রফেসর বোস দাবী করেছেন, যেহেতু একটা মানুষকে চুল রেলিঙে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা যায়না, তাই রাবেয়ার বক্তব্য মিথ্যে! হ্যাঁ, হতে পারে, অতিরঞ্জন এ বক্তব্যে আছে সেটা আমিও স্বীকার করি। কিন্তু ব্যাপারটা কি এমন নয় যে এই চুল রেলিঙে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখে মেরে ফেলার ঘটনা কয়েকটি ঘটেছে এবং তা দেখে যে শক রাবেয়া খাতুন পেয়েছেন সেই শক থেকেই তাঁর বিবরণে ব্যাপারটা ভয়াবহভাবে অতিরঞ্জিতভাবে উঠে এসেছে? একজন মনোবিজ্ঞানী তো ব্যাপারটা সেভাবেই দেখবেন। এই অতিরঞ্জন কোনভাবেই প্রমাণ করেনা যে রাজারবাগ পুলিশলাইনে অসংখ্য নারী নির্যাতিত হয়নি; বরং এই প্রসঙ্গে ড. বোস যে পাকিস্তানী অফিসারের বরাত দিয়েছেন সেই অফিসার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে একরাত ছিলেন মাত্র! যথেষ্ট হাস্যকর নয় কি?
প্রফেসর বোস আরো দাবী করেছেন যে রাজারবাগ পুলিশলাইন শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত, তাই এখানে কিছু ঘটলে অনেকেরই জানার কথা। আসলেই কি তাই? তিনি কি একবার এসে ঘুরে গেছেন? বাইরের রাস্তা থেকে এই কম্পাউন্ডের কতটুকু দেখা যায়? সেনাবাহিনী দখল করে বসে, এই কম্পাউন্দের ভেতরে সাধারণ জনগনের চলাচল নিষিদ্ধ করলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ভেতর কি হচ্ছে তা জানা কঠিন। আর সেই মুক্তিযুদ্ধের দিনে সাধারণ নিরীহ মানুষ এরকম স্থানগুলোর ব্যাপারে কৌতুহল প্রদর্শনের চেয়ে এড়িয়েছেই বেশী।
প্রফেসর বোস রাবেয়া খাতুনের টিপসই থেকে ধারনা করেছেন যে কেউ একজন মিথ্যে বিবরণ লিখে তাঁর সই নিয়েছেন। আমি যদি উল্টো প্রফেসর বোসকে জিজ্ঞেস করি যে 'একজন লেখাপড়া না জানা লোক তাহলে কিভাবে সাক্ষ্য দেবে?' অথবা, 'সাক্ষ্যপ্রদান করানোর জন্য একজনের কি লেখাপড়া জানতেই হবে?' -- তখন তিনি কি বলবেন? তাহলে এমন খেলো যুক্তি ব্যবহারের উদ্দেশ্যই বা কি?
সবশেষে তিনি বলেছেন, বাকী যে দুজন পুরুষ একই সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের সাক্ষ্য আর রাবেয়া খাতুনের সাক্ষ্যের মাঝে ক্রসচেক করে কোন অমিল না পাওয়া গেলেও, সাক্ষ্যগুলো বলা হয়েছে খুব শউদ্ধ ভাষায়, যেটা সাক্ষ্যদানকারীর কথ্য ভাষার সাথে মিলে যাবার কথা না। ড. বোস, এটা তো সর্বজনবিদিত যে, সাক্ষ্যগ্রহনের পর সেটাকে প্রমিত বাংলায় গ্রহনকারী লিপিবদ্ধ করতেই পারেন। তৎকালীন বাংলাদেশের সরকার বা প্রশাসন তো আর এখনকার কর্পোরেটদের মতো এত টিপটপ ছিলনা যে "সবসাক্ষ্য হেন ফরম্যাটের হতে হবে" টাইপের প্রটোকল ব্যবহার করেছে। যে যেভাবে পেরেছে দিয়েছে সাক্ষ্য, মনের ভালবাসা আর আক্রোশ থেকে, সেটাকে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে সত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য। আপনি কি পড়তে পড়তে সেটা টের পাননি?

৬. ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনীর বক্তব্যের সাপেক্ষে দূর্বল যুক্তি
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনীর বক্তব্যেও তিনি আগের মতই দূর্বল কিছু ডিসক্রিপেন্সী তুলে ধরার প্রয়াস দেখিয়েছেন। তিনি তুলে ধরেছেন যে ফেরদৌসী যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সেনাকর্তাদের মন জুগিয়ে চলেছেন, যেটার ফলাফল হয়েছে পাকিস্তানী সেনাকর্তারা ফেরদৌসীকে উপভোগ করেছেন। বক্তব্যের একটি জায়গায় ফেরদৌসী বলেছেন যে আলতাফ করিম (যিনি ফেরদোয়সীকে প্রেম নিবেদন করেন) নামের একজন মেজরই ছিল শুধু ভদ্র, বাকীরা সব নরপশু। প্রফেসর বোস ফেরদৌসীর লেখার সূত্র ধরে আলতাফ করিমের বসের নাম বের করেন, ব্রিগেডিয়ার হায়াত, এবং দেখান যে ব্রিঃ হায়াতকে যখন আলতাফ করিমের নাম বলা হলো, তিনি এই নামের কোন মেজরকে মনে করতে পারলেননা। আমি নিশ্চিত না একজন ব্রিগেডিয়ার যতজন মেজরের সাথে কাজ করেছেন সবাইকেই মনে রাখতে পারেন কিনা? বিশেষ করে, আমি ধারনা করতে পারি যে ৭১ এর সময় ব্রিঃ হায়াত যথেষ্ট বয়স্ক ছিলেন, ৩৬ বছর পার এখনকার বৃদ্ধের পক্ষে এই মনে করতে না পারাটা কিভাবে এতবড় প্রমাণ হিসেবে একটি একাডেমিক পেপারে স্থান পায়?
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, অস্তিত্বের সংগ্রামে অনিচ্ছা সত্বেও তিনি পাকিস্তানি সেনাকর্তাদের সাথে সুসম্পর্ক রেখেছেন, অপমান সহ্য করেছেন। এপ্রসঙ্গেই তাঁর আরেকটি বক্তব্যকেও খুব দূর্বলভাবে সন্দেহ করেছেন প্রফেসর বোস, যেখানে তিনি বললেন, (যখন বাংলাদেশ জিতে গেল যুদ্ধে তখনকার কথা)
"She was warned by a non-Bengali clerk in her office that she would be killed and should flee. Ferdousi makes much of the threat to her life – but as Bangladesh became independent, only those who were perceived to have willingly fraternised with the Pakistani regime were at risk of the wrath of freedom fighters, not victims of the regime"
এখানে প্রফেসর বোস বলতে চাইলেন যে যদিও স্বাধীন বাংলাদেশে
শুধু স্বেচ্ছায় পাকিস্তানীদের সহায়তাকারীদেরকেই শাস্তি দেয়া হয়েছে, তবুও অনিচ্ছায় পাকিস্তানীদের সাথে থাকা ফেরদৌসী নিজেকে "স্বাধীনতাকামীদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন" হিসেবে দেখিয়েছেন। যেহেতু বাঙালীরা তাঁর কোন ক্ষতি করেনি, সেহেতু তিনি তাঁর বক্তব্যে এই ভয়কে অতিরঞ্জন করেছেন। অতএব এই বক্তব্য গ্রহনযোগ্য না।
এটা কিভাবে সম্ভব?? ফেরদৌসী নিশ্চয়ই সেই মুহূর্তে জানতেননা যে তাঁর বিচার করা হবেনা যেহেতু তিনি অনিচ্ছায় নিরুপায় হয়ে পাকিস্তানীদের সাথে ছিলেন। তাই তিনি তো ভয় পাবেনই, তাঁর এই ভয়ের কথা তো তিনি লিখবেনই। এতে সমস্যা কোথায়?

৭. আখতারুজ্জামান মন্ডলের বক্তব্যের সাপেক্সে দূর্বল যুক্তি
প্রফেসর শর্মিলা বোস এরপর আরেকজন সাক্ষ্যদাতা আখতারুজ্জামান মন্ডলের সাক্ষ্যকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। জনাব মন্ডল তাঁর বিবরণে তাঁদের ভুরুঙ্গামারী যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ভুরুঙ্গামারি ক্যাম্পের পাকসেনাদের সাথে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর আড়াইদিনের যুদ্ধের পর জায়গাটি মুক্ত হয়। জনাব মন্ডল তাঁর বিবরণে লিখেন যে ক্যাম্প দখলের পর সিও অফিসের পাশের বাংকারে পাকিস্তানী গ্রুপের প্রধান আতাউল্লাহ খানের লাশ পাওয়া যায়, এবং চরিত্রহীন আতাউল্লাহ মৃত্যুর সময়ও একজন বাঙালী নারীকে জড়িয়ে ছিল।
ড. বোস তাঁর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এই বলে যে, আতাউল্খাহ খানকে জনাব মন্ডল আগে চিনতেন কিনা সেকথা তিনি কোথাও উল্লেখ করেননি, কাজেই জনাব মন্ডল কিভাবে আতাউল্লাহ খানকে চিনলেন? এই প্রশ্নটি শিশুসুলভ এই জন্য যে, জনাব মন্ডল না চিনলেও শত্রুপক্ষের পতনের পর তাদের প্রধানকে সনাক্তকরণের অনেক উপায় আছে। হয়ত আখতারুজ্জামান মন্ডল অন্যকারো মাধ্যমে জেনেছেন, হয়ত পরে জেনেছেন যে ঐ লোকটিই আতাউল্লাহ খান। আখতারুজ্জামান মন্ডল আতাউল্লাহ খানকে আগে দেখেননি বলে তার লাশ সম্পর্কে কিছু বলতে পারবেননা, এ কেমন যুক্তি?
একইসাথে ড. বোস বিভিন্ন পাকিস্তানী সেনাদের বরাত দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে আতাউল্লাহ খান একজন চরিত্রবান লোক ছিলেন, নারীর সম্ভ্রম নিয়ে পাশবিকতা করার মতো মানউষ তিনি না। আমার কথা হলো, নয়মাস ধরে হেন অপরাধ নেই করেনি এরকম একটি বাহিনীর সদস্যদের বরাত কতটুকু গ্রহনযোগ্য? প্রফেসর বোস আরো বলেছেন যে আড়াইদিন একটানা চলা যুদ্ধে একজন নারীর দেহ আঁকড়ে ধরে মারা গেছেন আতাউল্লাহ খান -- এটা ভাবা অসম্ভব (বেগার'স বিলিফ)। কথা হলো, প্রফেসর বোস কি জানেননা, একটানা যুদ্ধের মানে হলিউড মুভির সিন নয় যেখানে দুই আড়াইদিন ধরে ননস্টপ ফায়ারিং হয় আর সবাই নিজের জান বাঁচানো নিয়ে ব্যস্ত থাকে; অবশ্যই দুই পক্ষ অবস্থান নিয়ে সময় সুযোগমতো আক্রমণ করেছে। চরিত্রহীন পাকিস্তানী সেনাকর্তাদের পক্ষে সেরকম মুহূর্তে নস্টামি করা একশ ভাগ অসম্ভব -- এটাই বরং মানা কঠিন।

৮. সংখ্যাতাত্বিক ম্যানিপুলেশন
প্রফেসর বোস তাঁর সদ্য আবিস্কৃত থিওরীটিকে প্রমাণ করতে চেয়েছেন এভাবে -- ড. নীলিমা ইব্রাহীমের "আমি বীরাঙ্গনা বলছি" বইটিতে ড. নীলিমা সাতজন বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এঁদের সবাইকে কোন না কোন সেনাক্যাম্প থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা সাতজনই বলেছেন যে তাঁদের সাথে আরো বেশ কিছু বীরাঙ্গণা সেনাক্যাম্পে ছিলেন, যেখানে সংখ্যাটা ৫-৬ থেকে ২০-২৫ পর্যন্ত ছিল। প্রফেসর বোস এঁদের বক্তব্যে কোন উকিলীয় খুঁত ধরতে পারেননি, কিন্তু এই তথ্যগুলো দিয়ে এক চমৎকার অংক কষে ফেলেছেন। সাতজন সাক্ষ্যদাতার ক্ষেত্রে তিনি এই সংখ্যা (মোট নারীবন্দীর সংখ্যা) গড় করেছেন ১৩-১৪ জনায়। অর্থাৎ ৭ পূরণ ১৪ সমান প্রায় একশ' জনের হদিস তিনি স্বীকার করেছেন। তারপর তাঁর বিখ্যাত উপসংহার টানলেন এই বলে যে এই ১০০ জন যদি মোট ধর্ষিতার ১০ পার্সেন্ট হয়, তাহলে মোট ধর্ষিতা ১০০০, যদি ১ পার্সেন্ট হয় তাহলে মোট ধর্ষিতা ১০০০০, কিন্তু কোনভাবেই দুই লাখ সংখ্যাটাকে স্বীকার করে নেয়া যায়না। আমি বলো, এই সংখ্যাটা কেন ০.১ পার্সেন্ট নয়, ড. বোস? সেটা হতে বাঁধা কোথায়, সংখ্যাটা লাখের ঘরে চলে যায় -- এটাই বাঁধা?

শুনুন প্রফেসর বোস, আপনার ভুরুঙ্গামারীকে স্যাম্পল হিসেবে ধরেই হিসেব করুন, যদি ৯০ জনের মতো পাকসেনা থাকে সেখানে তাহলে সারা বাংলাদেশ জুড়ে প্রায় হাজারখানেক সেনাক্যাম্প ছিল। স্বাধীনতার প্রাকমুহূর্তে ভুরুঙ্গামারী ক্যাম্পে পাওয়া যায় ২০ জনের মতো বীরাঙ্গনাকে, অর্থাৎ ঠিক স্বাধীনতার সময়েই শুধু গড়ে বিশ হাজারের মতো নারীকে উদ্ধার করার কথা। সারা নয় মাসজুড়ে এভাবে তারা অসংখ্য বাঙালী নারীকে ক্যাম্পে এনেছে, মেরে ফেলে দিয়েছে। একইরকম অত্যাচার করেছে গ্রামে গ্রামে তাদের দোসর রাজাকার/আলবদর/শান্তিকমিটি -- এরা সবাই। তারওপর, পাকিস্তানী বাহিনী অনস্পট রেপ করেছে অসংখ্য, যেমন মানুষের বাড়ীঘর রেইড করে। মোট সংখ্যাটা দুই লাখ পেরিয়ে যেতে পারে বলেই অধিকাংশ বিষেশজ্ঞের ধারনা।
আপনি আবার পরিস্কার ভাবে বলবেন কি, ঠিক কোন তথ্য বা ক্লু'র ভিত্তিতে আপনি এমন একটি সংখ্যাকে "কয়েক হাজার মাত্র" বলতে চান?

প্রফেসর বোসের প্রবন্ধটির যেকথাটার সাথে আমি পুরোপুরি একমত সেটা হলো এই যে,
“The exaggerations and distortions of the issue of rape purveyed by many claiming to speak for the Bangladeshi liberation movement insult the true victims by trivialising their suffering, implying that it would not be noteworthy without the inflation of numbers and addition of gory perversions”
ঠিক, ধর্ষিতার সংখ্যা বাড়িয়ে বললে আসলে সত্যিকারের ধর্ষিতাদের অপমান করা হয়, কারণ তাতে এমন একটা নির্দেশনা থাকে যে আমাদের আরো ভিকটিম চাই, নাহলে ঠিক জমবেনা। কিন্তু, ৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাপেক্ষে একথাটা কতটুকু খাটে? ড. বোস, উল্টো করে বলি, ধর্ষিতার সংখ্যা দু লাখ হবার পরও আমরা যদি লজ্জায় চোখ ঢেকে সংখ্যাটাকে "কয়েক হাজার" বলে প্রলাপ বকি, তখন কি ধর্ষিতাদের অপমান করা হয়না? তখন কি তাঁদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে এটাই বলা হয়না যে "তোমার ক্ষতি হয়েছে তাতে আমার কি, আমার তো কোন ক্ষতি হয়নি!"?
 

আব্দুল মুকিত

  ভাবনা-দুয়ার