এক
“ক্রিসমাসে তোমার প্ল্যান কি?”
দাঁড়িগোঁফ ভরা মুখে আনন্দের হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন কম্পিউটার সায়েন্সের ডাঁকাবুকো
প্রফেসর ডক্টর অ্যান্ডারসন।
“কোনো প্ল্যান নাই!”
“প্ল্যান নাই মানে? বলছ কী! আমি তো টরান্টো যাচ্ছি। বউ বাচ্চার সাথে ক্রিসমাস
করবো।” চোখ টিপে বললেন ডক্টর অ্যান্ডী। উনি যে ক্রিসমাসে টরান্টো যাচ্ছেন এটা আগে
থেকেই যানা আছে শাহেদের। এর আগে উনি নিজেই কমপক্ষে চারপাঁচ বার সে কথা জানিয়েছেন,
“এক কাজ করো একেবারে দেশে চলে যাও, না-কী? বাবা-মার সাথে ক্রিসমাস করো। দু’হপ্তার
ছুটি তো পাচ্ছই? গ্লাস ভর্তি এগনগ আর ওভেন থেকে বের করা টার্কির ঘ্রান না পেলে আমার
তো মনেই হয়না ক্রিসমাস হচ্ছে!”
ডক্টর অ্যান্ডারসন ভালো মতই জানেন শাহেদ নাস্তিক। আর ওর পুরো নাম দেখে ওর জন্ম যে
একটা মুসলমান পরিবারে হয়েছে সেটা অনুমান করাও কষ্টসাধ্য নয়। কিন্তু শাহেদ লক্ষ্য
করে দেখেছে ক্রিসমাসটা কানাডীয়ানদের জীবনযাত্রার সাথে এমন অবিছেদ্য ভাবে জুড়ে গেছে
যে ইহুদী ছাড়া কেউ ক্রিসমাস পালন করছে না এটা তারা ঠিক তাদের মাথায় নিতে পারেনা।
শাহেদ খুব নির্লিপ্ত গলায় বলে, “আমার বাবা-মা বেঁচে নেই। পাঁচ বছর আগে তাঁরা মারা
গেছেন।”
শাহীনের কথায় ডক্টর অ্যান্ডারসনের হাসিটা দপ করে নিভে যায়। তিনি বলেন, “দুঃখীত
শাহেদ! আমার কোনো ধারনাই ছিল না। যদি কিছু মনে না করো জানতে পারি কি? কিভাবে?”
“একটা দূর্ঘটনায়!”
প্রফেসর আর কথা বাড়ালেন না। শাহেদের পড়ার জন্য তিনি এক তাড়া পেপার প্রিন্ট করে
রেখেছিলেন। শাহেদ সেগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে করে রুম থেকে বের হয়ে আসে।
গত পাঁচ বছরে এ প্রশ্নটা ওকে হাজার শুনতে হয়েছে। কিভাবে ওর বাবা-মার মৃত্যু হলো?
মৃত্যুর কারণটা এত কূরুচীপূর্ণ যে শাহেদ চেষ্টা করেছে প্রতিবারই সেটা এড়িয়ে যেতে।
পশ্চিমারা সাধারণত “দূর্ঘটনা” শোনার পর আর কথা বাড়ায় না, বুঝে যায় প্রসঙ্গটা ওর
পছন্দ নয়। কিন্তু সমস্যা হয়ে যায় যখন বাংলাদেশী, বিশেষত ত্রিশোর্দ্ধ কোনো
বাংলাদেশীর সাথে কথা হয়। তাঁরা জিজ্ঞাস করতেই থাকেন, “কি দূর্ঘটনা? ক্যামনে হইলো?
কবে? ক্যানো?” প্রথম দিকে বাধ্য হয়েই দু’একটা করে প্রশ্নের জবাব দিতো ও। এখন সরাসরি
বলতে শিখেছে, “আমি এ বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না।”
প্রফেসরের রুম থেকে বের হয়ে দো’টানায় পড়ে যায় শাহেদ। মাস্টার্সের দ্বিতীয় বর্ষে ওর
কোনো ক্লাস নেই। আজ ল্যাবেও কোনো কাজ জমে নেই। স্কুলে আসার প্রধান কারনই ছিল
অ্যান্ডীর সাথে দেখা করা। বাবা-মা’র প্রসঙ্গটা চলে আসায় সে সাক্ষাৎ পর্ব নিমিষেই
শেষ হয়ে গেল। এখন এত সকাল সকাল বাসায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না।
একটা কাজ করা যায়। টিম হর্টনস থেকে এক কাপ হটচকোলেট নিয়ে অফিসে গিয়ে বসা যায়।
“গবেষণা সহায়ক” হিসেবে ওকে স্কুল থেকে একটা চমৎকার অফিস দেয়া হয়েছে। একজন মাস্টার্স
ছাত্রের প্রেক্ষিতে রুমটা অসাধারণই বলতে হবে। আকারে ছোটখাট হলেও রুমে কাজ করার
টেবিল, একটা হাই কনফিগারেশন ডেস্কটপ কম্পিউটার , বড় শেলফ ভর্তি বই, দেয়ালে কয়েকটা
প্রোজেক্ট পোস্টার, সস্তা কাউচ, দু’টো টবে বাহারী গাছ... সবই আছে।
নিজের অফিসে ঢুকে ডেস্কটপটা চালু করে হটচকোলেটে চুমুক দেয় শাহেদ। লিনাক্স বুট
হচ্ছে। বুট স্ক্রিনের দ্রুত পরিবর্তন হওয়া স্ক্রীন, আর সেই স্ক্রীনে সবুজ “OK” লেখা
দেখতে দেখতে হঠাৎ-ই ওর মনে প্রশ্ন জাগে, ওর এ জীবনটার কি মানে? কার জন্য এই বেঁচে
থাকা, কিসের জন্যই বা রাতদিন এই কষ্ট করা? ওর অর্থহীণ জীবনে প্রতিদিন একটা করে নতুন
সকাল জুড়ে কার কি লাভ হচ্ছে? ওর জীবনে তো কোনো আনন্দ নেই! ধর্মে বিশ্বাস নেই বলে
পাপ-পূর্ণ্যের হিসাবনিকাশ আর দোজখ-বেহেশতের ভয় কিংবা আকাঙ্খাটাও নেই। ধার্মিকদের এই
একটা কারনেই মাঝে মাঝে হিংসা হয় ওর। ওদের প্রগাঢ় বিশ্বাস এই জীবনের একটা বিশেষ অর্থ
আছে, লক্ষ্য আছে। আমাদের জীবনটা হটাৎ ঘটে যাওয়া কোন দূর্ঘনার ফল নয়, বরং কোন বড়
পরিকল্পনার অংশ। এ চিন্তাটাই তো বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ঠ! কিন্তু যারা শাহীনের মতো
নাস্তিক, তাদের বাঁচার তাগীদটা আসে অন্য কোথাও থেকে। সেটা হতে পারে ভালোবাসার
ব্যাক্তি, প্রকৃতি বা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গীক কোনো কিছু। কিংবা অনেক নাস্তিক যেমনটা
বলেন, “ওসব কিছু না। বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে কারণ বেঁচে থাকার প্রতিটা মূহুর্ত আমার
ভালো লাগে!” একটা দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে শাহেদের অবষন্ন দেহ থেকে। হায়রে, সেও যদি এমন
কথা বলতে পারতো!
বাট্রার্ন্ড রাসেলের সাথে গলা মিলিয়ে হুমায়ুন আজাদ স্যারও বলেন, “এ জীবনটা
অন্ধকারের মাঝে একটা ক্ষণস্থায়ী আলোর ঝিলিক মাত্র, যে ঝিলিকের আগেও অন্ধকার, পরেও
অন্ধকার”। শাহেদ জানে সেই আলোর ঝিলিক নিজের ইচ্ছাতে শেষ করে দেবার সাধ্য তার আছে।
তবে কেন সে সেই ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করবে না?
কম্পিউটার চালু হবার আগেই শাহেদ সির্দ্ধান্ত নিয়ে ফেলে “ও আত্মহত্যা করবে”!
দুই
দুম করে কোনো সিদ্ধার্ন্ত নেবার মত মানুষ শাহেদ নয়। আত্মহত্যার চিন্তাটা হুট করে
এলেও সারাটা দিন শাহেদ সেই সিদ্ধার্ন্তের যৌক্তিকতা নিয়েই চিন্তা করে। ওর মনে হয়
আসলেই ওর অহেতুক জীবনটা বয়ে বেড়ানোর কোনো কারণ নেই। বিকালে টিভির সামনে কোলের উপর
নিজের ল্যাপটপটা নিয়ে বসে শাহেদ। সিদ্ধার্ন্তটা যখন নেয়াই হয়েছে, কাজটা সূচারূ হতে
হবে। প্রথমে দেখতে হবে ওর আত্মহত্যায় কারো কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি-না? কারো ক্ষতি করে
আত্মহত্যা করাটা স্বার্থপরের মত কাজ হয়ে যাবে। যদি কারো ক্ষতি না হয় তাহলে দেখতে
হবে “কখন” এবং “কিভাবে” আত্মহত্যা করা যায়। ওর আত্মহত্যায় কেউ কষ্ট পাবে নাকি সেটাও
বিবেচনায় রাখতে হবে।
দেশে ওর ছোটমামা, ছোটখালা আর সৎ বড়চাচা ছাড়া আর কেউ নেই। ওদের কারোরই ওর মৃত্যুতে
কাতর হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। দেশে ফেলে আসা বন্ধুবান্ধবরা জানলে নির্ঘাত কষ্ট পাবে।
কিন্তু ওরা জানবেই বা কিভাবে? গত পাঁচ বছর ধরে ও আস্তে আস্তে দেশের সবার সাথেই
সম্পর্ক ছেদ করেছে। আর জানলেও এতদিন পরে ওর মৃত্যু সংবাদ ওদের মনে তেমন গাঢ় ছাপ
ফেলবে কি? মনে তো হয় না! এবার দেখা যাক কানাডাতে কি অবস্থা। এখানে সহপাঠী, সহকর্মী
আর শিক্ষকরা ওর মৃত্যু সংবাদে চমকে যাবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু ও সবার সাথেই
একটা দূরত্ব বজায় রাখে, তাই সে চমকটার কষ্টে রূপান্তরীত হয়ে যাবার সম্ভাবনা বলতে
গেলে খুবই কম।
তবে ক্ষতির প্রশ্নে একটু সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। ওর মৃত্যুতে সামান্য কিছু ক্ষতি হতে
পারে। প্রথমত ধরা যাক অ্যান্ডীর কথা। ওর সাথে গত এক বছর ধরে “প্যাটার্ন রেকগনীশন”-এ
গবেষণা করছে শাহেদ। এখন হটাৎ করে সে “নাই” হয়ে গেলে বেচারা সমস্যায় পড়ে যাবে। এটার
একটা সহজ সমাধান অবশ্য মাথায় আসছে। ডিপার্টমেন্টে নতুন একটা মেধাবী ছেলে এসেছে -
ব্রায়ান। শাহেদের গবেষণায় খুব আগ্রহ। ওর আগ্রহ দেখে অ্যান্ডীও বলেছে শাহেদের
গ্রাজুয়েশন হয়ে গেলে ব্রায়ান ইচ্ছে করলে ওর গবেষণাটা চালিয়ে যেতে পারে। অতি উৎসাহী
ব্রায়ানও তাই মাঝে মাঝেই ওর অফিসে এসে বসে থাকে। এটা ওটা প্রশ্ন করে গবেষণার
অগ্রগতিটা বোঝার চেষ্টা করে। ছেলেটাকে একদিন দু’তিন ঘন্টা ব্রীফ দিলেই সে মোটামুটি
ব্যাপারটা বুঝে ফেলবে। কথাটা ভেবে হাসিই চলে আসলো শাহেদের। এক বছরের গবেষণা বোঝাতে
সময় লাগবে মোটে দু’ঘন্টা! যাক, তবুও তো এ সমস্যার একটা সমাধান হলো।
আরেকটা ক্ষতি হতে পারে বাড়ীওয়ালীর। যে বুড়ী ভদ্রমহীলা শাহেদকে বাসাটা ভাড়া দিয়েছেন
তিনি মাসে ৭০০ ডলার করে পান। ওটা ক্রিসমাসের আগে আগে বিনা নোটিশে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
আর আত্মহত্যা হওয়া বাসা ভাড়া দেয়াটাও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার! কানাডার মত উন্নত দেশেও
কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের অভাব নেই। এখানে বাসা ভাড়া নেয়ার রেওয়াজ অনুযায়ী অবশ্যি
ভদ্রমহীলাকে প্রথম ও শেষ মাসের ভাড়াটা অগ্রীম দেয়া আছে। আজ মাসের ১৪ তারিখ, তার
মানে ১৬+৩১ মোটমাট ৪৭ দিন সময় পাচ্ছেন তিনি বাসাটা ভাড়া দেয়ার জন্য। তবে এর মধ্যে
থেকে ২০ দিন বাদ দেয়া যাক পুলিশী ঝামেলার জন্য। এক্ষেত্রে বেচারীর আসলেই ক্ষতি হয়ে
যাচ্ছে! একটা কাজ করে ব্যাপারটা কাটাকুটি করা যায়। শাহেদ যদি বুড়িকে দুই মাসের ভাড়া
অগ্রীম দিয়ে দেয় তাহলে ভদ্রমহীলা প্রয়োজনের চেয়েও বেশী সময় পাচ্ছেন বাসাটা ভাড়া
দেবার জন্য।
আর কিছু? একটু ভাবতেই শাহীনের মনে পড়ে ওর ক্রেডিটকার্ড গুলোতে বেশ ভালো রকমের একটা
অংক দেনা পড়ে আছে। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই অবশ্য। সামান্য ক’টা ডলারের
জন্য চড়া সুদ নিয়ে যে পরিমান অর্থ তারা এ পর্যন্ত কামিয়ে নিয়েছে সেটাই যথেষ্ঠ।
সমস্যা হতো যদি খুব বড় রকমের দেনা থাকত, কিংবা কানাডাতে যদি ওর কোনো নিকটাত্মীয়
থাকত। তাহলে দেনাগুলো সব গিয়ে সেই আত্মীয়ের উপর পড়তো। সেটা না থাকায় নিয়মানুযায়ী ওর
মৃত্যুর পরপরই ক্রেডিট ডিপার্মেন্ট ওর নেবার মত স্থাবর-আস্থাবর সম্পত্তি (যা বলতে
গেলে প্রায় শূন্য) বাগিয়ে নিয়ে ওর ক্রেডিটফাইলটা বন্ধ করে দেবে।
এখন দুঃস্বপ্নের মত লাগে, কিন্তু এই ক্রেডিটকার্ড গুলোই এক সময় ওর জীবন রক্ষা
করেছে। বাবা-মার মৃত্যু-সংবাদ পেয়ে দেশে ফিরে গিয়ে যা দেখলো শাহেদ তাতে দু’দিন শুধু
বমি করেছে। ততদিনে বাবার ব্যাবসা-সম্পত্তি সব চলে গেছে ক্ষমতাধর সৎ চাচার হাতে।
চাচা অবশ্য পিঠে কপট হাত রেখেছিলেন, “সব তো তোমারই! আমি কেবল তোমার হয়ে সামলাচ্ছি।
তুমি কানাডাতে চলে যাও, বাবা-মার খুব শখ ছিল তুমি পি.এইচ.ডি করবে! তোমার বাবা যেমন
বছর-বছর টাকা পাঠাতেন, আমিও পাঠাবো। তুমি লেখাপড়াটা শেষ করে এসো।”
প্রতিবাদ, প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো ও। আত্মীয়রা সবাই একজোট হয়ে গেলেন।
বাবার তরতর করে সাফল্যের শিখরে ওঠা নিয়ে যে এত ঈর্ষা জমা ছিল সবার মনে সেটা ও
কল্পনাও করতে পারেনি। অস্বাভাবিক মৃত্যুর কেসটাও পুলিশকে টাকা খাইয়ে কিভাবে যেন
গায়েব করে দিলেন চাচা। এত অসহায় আগে কখনো বোধ করেনি শাহেদ। একদিন পার্কে একা বসে
হাউমাউ করে কাঁদছে দেখে কাছে এসে বসে মাঝবয়সী এক বাদালওয়ালা। প্রগাড় মমতায় হাত রাখে
গুমড়ে গুমড়ে ওঠা শাহেদের পিঠে। কি মনে করে যেন অচেনা বাদামওয়ালা মামাকে সব কথা বলে
ফেলে ও। নির্বাক বিস্ময়ে মীণচোখে তাকিয়ে থাকেন মামা। আস্তে করে বলেন, “ভাইজান আপনি
আবাত বিদিশ ফিরি যান। এহান থাকলি বাঁচতি পারতেন নো!”
সে উপদেশ বাধ্য হয়েই মেনে নেয় শাহেদ। দেশে থাকলে আসলেই ওর জীবনসংশয় হতো। আর ততদিনে
ওদের বাড়িটাও দখল হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজনরা রোজই সেখানে বাটোয়ারা নিয়ে বৈঠক
বসাচ্ছেন। এসব ছেড়ে-ছুঁড়ে কানাডাতে পালিয়ে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার ব্যাপারটা তাই ছিল।
পরাজিত যোদ্ধার মত বাবা-মার কবর জিয়ারতে যায় শাহেদ। সংকোচে মাথা নিচু করে বলে,
“পারলাম না বাবা, আমি তোমার মত যুদ্ধ জিততে পারলাম না। তোমার কাপুরুষ ছেলেকে ক্ষমা
করে দিও মা!”
কানাডায় ফিরে এলো শাহেদ। মাস ঘুরে বছর গেল, একটা টাকাও পাঠালেন না চাচা। টাকা
পাঠাবে সেই দূর চিন্তাটাও অবশ্য ওর ছিলনা। প্রথমেই নিজের শখের গাড়িটা বিক্রি করে
দিল ও। পরে একে একে বিক্রি করার মতো যা ছিল সব! সারা জীবনে অর্থকষ্ট কাকে বলে জানে
নি। এখন বোঝে শাহেদ, আগে প্রাচুর্যের খোলশে আবৃত থেকে পৃথিবীর প্রকৃত রূপের সাথেই
ওর পরিচয় ছিলনা। সেসময় একটা খন্ডকালীন চাকরী খুঁজতে খুঁজতে ক্রেডিটকার্ডের দেনা
বাড়তে লাগলো। ভাগ্য সহায় ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীনের সাথে দেখা করার পর লেখাপড়ার
বেতনটা কমিয়ে অর্ধেক করে দিলেন তিনি, লাইব্রেরীতে একটা চাকরীও জুটিয়ে দিলেন।
প্রচন্ড কৃতজ্ঞ শাহেদ ভদ্রলোকের উপর। তাঁর সাহায্য না পেলে এতদূর কোনো ভাবেই আসা
সম্ভব হতো না ওর। লেখাপড়ায় আগে থেকেই ভাল ছিল, সেই সাথে “কিছু করতে হবে” সেই জিদ
যোগ হওয়ায় প্রচন্ড ভাল ফলাফল হলো আন্ডারগ্র্যাজুয়েটে। বের হয়েই পেয়ে গেল সরকারী
গবেষণা ফান্ড, সেই সাথে চড়া ফান্ডিং সহ মাস্টার্স-এর অ্যাডমিশন। অর্থকষ্ট দূর হয়ে
গেল সেই থেকেই।
মনটাকে জোরকরে বর্তমানে এনে ল্যাপটপে একটা মাইক্রোসফট ওয়ার্ড খুলে দ্রুত নোট নেয়
শাহেদ:
- আমার মৃত্যুতে কানাডা/বাংলাদেশে কারো কোনো মানসিক কিংবা আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে না।
এবার পুলিশী ঝামেলার ফয়সালাটা করা যাক। মনে হয় না ওর মৃত্যুতে কাউকে কোনো পুলিশী
ঝামেলা পোহাতে হবে। ওকে হত্যা করার পেছনে হাজার খুঁজলেও কেউ কোনো মোটিভ খুঁজে পাবে
না। ব্যাপারটা হবে একটা “টেক্সটবুক আত্মহত্যার কেস”। তবু সতর্কতার জন্য দু’টো
সুইসাইড নোট রাখতে হবে। একটা হাতে লিখে। কম্পিউটারে প্রিন্টআউট নিলে হবে না। পুলিশ
যেন হাতের লেখা মিলিয়ে নিশ্চিত হতে পারে সে সুযোগটা রাখতে হবে। আরেকটা হবে ভয়েসনোট।
টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করে সেই টেপটা টেবিলে নোটের সাথে রেখে দিতে হবে। ওর কন্ঠ যে
কেউ সহজেই সনাক্ত করতে পারবে। সবচেয়ে ভালো হতো যদি একটা ক্যামকর্ডার থাকতো। পুরো
ব্যাপারটাই তাহলে ভিডিও করে রাখা যেত। তবে ক্যামকর্ডার ছাড়াও ব্যবস্থাটা খুব একটা
মন্দ দাঁড়াচ্ছে না!
আরেকটা ব্যাপার চট করে মাথায় আসলো ওর। পুলিশ আসবে ভাল কথা কিন্তু কত সময় পর? সামনে
ক্রিসমাস তাই এমনিতেই সবাই একটা ছুটির আমেজে। এছাড়া ও থাকেও একা। কেউ নিয়মিত ফোনও
করে না যে ও ফোন না ধরলে দুঃশ্চিন্তা করবে। একবার সংবাদপত্রে পড়েছিল শাহেদ,
মন্ট্রিয়লে এক বৃদ্ধা মহিলা নিজের বাসায় মরে পড়ে ছিলেন। কেউ জানতো না। ঘটনা ধরা পড়ে
যখন তাঁর মরদেহ পঁচে গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। এমনটা হলে তো সমস্যা! ওর মরদেহ পঁচেগলে
দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এমন বিতিকিচ্ছিরী ঘটনা মোটেই ঘটতে দেয়া যায় না!
আত্মহত্যার ঠিক আগেই ৯১১ ডায়াল করলে কেমন হয়? সেক্ষেত্রে একটা ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
ওদের রেসপন্স টাইম এতো ভালো হয়তো দেখা যাবে ও মারা যাবার আগেই প্যারামেডিক এসে
উপস্থিত! আর অসফল আত্মহত্যার মত ন্যাক্কারজনক আর কিছু হতে পারে না। পুলিশ ওর পরিচিত
সব্বাইকে ওর অপ্রকৃতস্থ মানসিক অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক করে দেবে। এরপর থেকে সবাই ওর
দিকে এমন ভাবে তাকাবে যেন সে ভিনগ্রহের কোনো বানরবিশেষ! সেই সাথে যোগ হবে
বাধ্যতামূলক ভাবে প্রতিদিন তিনবার কাউন্সেলকে ফোন করে হালহকিকত বর্ণনা আর সপ্তাহে
একদিন মুখোমুখি কাউন্সেলিং সেশন!
এই সমস্যাটারও একটা চমৎকার একটা সমাধান মাথায় চলে আসলো শাহেদের। অ্যানসারিং মেশিনে
একটা মেসেজ রাখলেই হয়ে যাচ্ছে। মেসেজটা হবে এই রকমের, “এ মেসেজটা শোনমাত্র পুলিশকে
কল করে জানান আমি, আহমেদ শাহেদ রহমান, আত্মহত্যা করেছি। এটা কোনো স্থূল ঠাট্টা নয়!”
ধরা যাক আত্মহত্যার সময় ঠিক হয়েছে দুপুর ২:৩০-এ, তাহলে নির্ভরযোগ্য কাউকে বিকাল
৪:৩০-এর দিকে ওকে ফোন করতে বলতে হবে। সবচে’ ভাল হয় অ্যান্ডীকে বললে। ও যে রকমের
রিরিয়াস মানুষ, ওর যদি সন্দেহ হয় এটা ঠাট্টা তবুও সাথে সাথেই পুলিশ ডাকবে শুধু
নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে ওটা আসলেই ঠাট্টা ছিল! ল্যাপটপে নোট নিতে নিতে ভাবে শাহেদ,
আত্মহত্যার ব্যাপারটা প্রথমে যতটা সহজ মনে হচ্ছিল আসলে ততটা নয়। একটা পরিষ্কার
আত্মহত্যার কাঠামো তৈরী করাটা যথেষ্ঠ ঝামেলার কাজ!
এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় - আত্মহত্যার পদ্ধতি! কাজটা বাসায় করা হবে বলে
এমনিতেই অবশ্য হাতে বেশী উপায় নেই। ল্যাপটপে একটা ইন্টারনেট ব্রাউজার খুলে গুগল
সার্চইঞ্জিনে “ঘরের মধ্যে আত্মহত্যার পদ্ধতি” লিখে সার্চ দেয় শাহেদ। ফলাফল দেখে
বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠে ওর, আঠারো লক্ষ নব্বুই হাজার ম্যাচ! মানুষের তো দেখা যাচ্ছে
আত্মহত্যাতে ভালই আগ্রহ! কয়েকটা সাইট ঘুরে দেখে ব্রাউজারটা বন্ধ করে দেয় শাহেদ। যা
দেখার দেখা হয়ে গেছে। সবই পদ্ধতিই আগে থেকে জানা। কিছু কিছু সাইটে আবার সেসব জানা
পদ্ধতিতেই জোর করে নাটকীয়তা আনা হয়েছে। অত নাটক করতে গেলে আসল কাজটাই গুবলেট হয়ে
যাবার সম্ভাবনা। এরচে’ সনাতন ভাবেই পদ্ধতিগুলোই দেখা যাক:
১) গলায় দড়ি: এটা করা যাবে না। একটা মেয়েলি মেয়েলি ভাব আছে। আর শাহেদ শুনেছে
শ্বাসরুন্ধ হয়ে মৃত্যুটা প্রচন্ড কষ্টকর।
২) আগুন: অসম্ভব! সবচেয়ে ভয়াবহ মৃত্যুগুলোর মধ্যে এটা একটা। আর দেহের আগুন সারা
বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ার একটা সম্ভাবনা আছে।
৩) বিষ: এটা সম্ভব। বাজারে নানান রকম বিষ পাওয়া যায়... ইদুর মারা, তেলাপোকা মারা।
এর যে কোন একটা কফির সাথে খেয়ে ফেল্লেই ঝামেলা শেষ। বিষ না পাওয়া গেলে ঘুমের বড়ি
দিয়েও কাজ চালানো যায়।
৪) ধমণী কেটে ফেলা: নিঃর্ঝঞ্জাট পদ্ধতি। এটাও সম্ভব।
৫) গ্যাস: বাসার দরজা-জানালা বন্ধ করে স্টোভের গ্যাস ছেড়ে দিলে একটা আরামজনক মৃত্যু
হবে। কিন্তু এটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ একটা সিগারেট ধরালেই সেই আগুনের স্ফূলিঙ্গেই
পুরো বাড়ি নিমিষে ধংসস্তুপ হয়ে যাবে। এটা বাদ দেয়া যাক। একে এতে অন্যের জানমালের
ক্ষতির সম্ভাবনা থাকছে। আর মৃত্যুর আগে একটা সিগারেট না খেলে কিভাবে হয়!
৬) আগ্নেআস্ত্র: এটা সব চেয়ে ভাল ছিল। মাথায় পিস্তলের একটা গুল্লি মুহূর্তে সব
ল্যাঠা শেষ। তবে এটা সম্ভব হচ্ছে না যেহেতু আগ্নেআস্ত্র জোগাড় করাটা ওর জন্য প্রায়
অসম্ভব।
তাহলে লিস্টের মধ্যে বেছে নেয়ার মত থাকছে দু’টো তরিকা - বিষ আর ধমনী। এ দু’টোর
মধ্যে থেকে ধমনীটাই বেছে নিল শাহেদ। বিষে আদৌ কাজ হবে নাকি কে জানে। বাজারে যেসব
বিষ বিক্রি হয় সেগুলোতে তেলাপোকাই মরে না, আর তো শাহেদ! আর ঘুমের বড়ির জন্য
প্রেসক্রিপশন লাগে, সেটা সংগ্রহ করা একটা ঝামেলার কাজ। এছাড়া ধমনী কাটার মধ্যে একটা
রোমান্টিক ভাব আছে। চোখ বুঁজে কল্পনা করে শাহেদ - মৃদু গরমপানি ভর্তি বাথটাবে শুয়ে।
এক হাতে একটা কাটগ্লাসে রেড ওয়াইন। ঠোঁটে জ্বলছে কিউবান সিগার। পাশের রুম থেকে মৃদু
শব্দে ভেসে আসছে এয়ার সাপ্লাইয়ের গান “গুডবাই”, সেই সাথে হাতের কাটা ধমণী থেকে লাল
টকটকে রক্ত গড়িয়ে মিশে যাচ্ছে বাথটাবের পানির সাথে। অসাধারণ!
মুচকী হেসে নোট নেয় শাহেদ, আত্মহত্যার পদ্ধতি - রক্তস্বল্পতা!
তিন
গাড়িটা পার্ক করে সুপারস্টোরের দিকে হাঁটে শাহেদ। অনেক হিসাব করে আগামীকাল দুপুর
দু’টোয় আত্মহত্যার দিনতারিখ ধার্য্য হয়েছে। গত কয়েকটা দিন খুব ব্যস্ত কেটেছে সব
পরিকল্পনা মত আয়োজন করতে। কাজগুলো করতে এত সময় লাগবে সেটা ও আগে বুঝতে পারেনি। যেমন
ওর ধারনা ছিল ব্রায়ানকে ওর গবেষণা ও দু’ঘণ্টাতেই বুঝিয়ে দেবে। সেটা হয়নি। পাক্কা
দু’দিন সময় লেগেছে! বুড়িকে অগ্রীম ভাড়া দেয়া নিয়েও সমস্যা হয়েছে। উনি কিছুতেই
অগ্রীম নিতে চান না। একসাথে বেশী টাকা হাতে আসলে নাকি তার সব “বিংগো” আর
“ক্যাসিনোতে” উড়িয়ে দেয়ার অভ্যেস আছে! এটা-সেটা বলে, অনেক বুঝিয়ে, অবশেষে বুড়িকে
রাজী করানো গেছে। অ্যান্ডারসনকে আগামীকাল বিকাল পাঁচটায় বাসায় কল দিতে বলতে গিয়েও
ফ্যাকড়া। অ্যান্ডী বলে মোবাইল থাকতে ও কেন বাসার নাম্বারে কল করবে! এই প্রশ্নটা যে
অ্যান্ডী করতে পারে সেটা আগে ওর মাথায়ই আসেনি! এদিকে সমস্যা হচ্ছে ওর মোবাইলে ভয়েস
মেইলেই সিস্টেম নেই। কাজেই পরিকল্পনা ঠিক রাখতে হলে বাসাতেই কল দিতে হবে।
অ্যান্ডীকেও অবশ্য শেষে কোনো এক রকমে বুঝ দেয়া গেছে।
আরেকটা দিন গেছে সব দেনা-পাওনা চুকাতে। বাসায় লাইব্রেরীর বই ছিল, ব্লকবাস্টারের
ডিভিডি ছিল, সেগুলো ফেরত দেয়া হয়েছে। ব্যাঙ্কে যত টাকা ছিল তার কিছু রেখে বাকি সব
চ্যারিটিতে ডোনেট করা হয়েছে। সুইসাইড নোট গুলোও সব রেডী। ওর বাসায় সিডি, ডিভিডি, বই
সহ আর যা যা কিছু আছে তার একটা পূর্ণ লিস্ট বানাতে গেছে আরেকটা দিন। ও সেই লিস্টে
ঠিক ঠিক করে লিখে রেখেছে ওর কোন জিনিসটা যাবে স্যালভেশন আর্মিতে, কোনটা রেডক্রসে,
আর কোনটা স্কুলের লাইব্রেরীতে। ওর ইচ্ছা ওর মৃতদেহটা কোনো মেডিকেল স্কুলে ডোনেট
করা, সেটাও ও স্পষ্ট ভাবেই লিস্টে লেখা আছে। বাসাটাও একটু সাফ-সুতরো করা হয়েছে।
পুলিশের রিপোর্টে নিজের বাসস্থান সম্পর্কে কোন বাজে মন্তব্য চায়না শাহেদ!
আজ শেষ দিনে ও বের হয়েছে জীবনের শেষ কেনাকাটা গুলো সেরে ফেলতে। একটা কিউবান
রোমিও-জুলিয়েট সিগার লাগবে। কবে যেন শুনেছিল একটার দামই নাকি ১০০ ডলার! নতুন একটা
বক্সার কিনতে হবে। মৃতদেহ আবিষ্কারের পরপরই পুলিশ অসংখ্য ছবি তুলে, উলঙ্গ অবস্থায়
মৃত্যুর পরেও ছবি তুলতে আপত্তি আছে ওর, তাই নগ্ন ভাবে বাথটাবে নামা যাবে না। নতুন
বক্সারটা পড়ে তবেই সে বাথটাবে নামবে। ওন্টারিও ভিনইয়ার্ডের সবচেয়ে দামী রেড ওয়াইনটা
কিনতে হবে। আর কিনতে হবে ধমণী কাটার জন্য একটা নকশাকাটা ইটালীয়ান ক্ষুর। কাজটা
ব্লেড দিয়েই করা যেত, কিন্তু জীবনের শেষ কাজটায় শাহেদ একটা আভিজাত্যের ছাপ রাখতে
চাচ্ছে। সব কেনাকাটা দেড় ঘন্টার মধ্যেই শেষ হয়ে গেল।
আজ দিনটা শীতকালের প্রেক্ষীতে বেশ সুন্দরই বলতে হবে। চমৎকার রোদ উঠেছে। বাতাস কম,
ঠান্ডাও প্রায় নেই বল্লেই চলে। সুপারস্টোরের পাশেই একটা ছোট্ট লেক। যদিও এখন সেটাকে
লেক বলে চেনার উপায় নেই। পুরোটাই বরফ হয়ে আছে। লেকের পাশে বেঞ্চ গুলোও সব তুষারে
সাদা। স্টোর থেকে বেরিয়ে লম্বা পা ফেলে সেদিকেই হেঁটে যায় শাহেদ। তুষার সরিয়ে বসে
পড়ে একটা বেঞ্চের উপর। সূর্যের আলো বরফ-লেকে পড়ে কী চমৎকারই না লাগছে! শাহেদের
বামপাশের মেপ্যল গাছটায় জমে থাকা তুষার বাতাসের সাথে অল্প অল্প করে লেকে ঝরে পড়ছে।
হাত দিয়ে আড়াল করে একটা সিগারেট ধরায় শাহেদ। ঠিক এ সময়, হঠাৎ করেই, কোনো নোটিশ
ছাড়াই, চোখে পানি চলে আসে ওর। এক ফোঁটা দু’ ফোঁটা করে পড়তেই থাকে... আবিরাম। এ কেমন
অভীমান ওর সবার উপর? জীবনের কাছে এমন কি চেয়েছে ও যে না পাওয়ার অভিমানে চলে যেতে
হচ্ছে? অর্থহীন এ জীবনটাকে ঘিরে কত কামনা-বাসনা-সুখ-আশা-ভালোবাসা-আনন্দ মানুষের...
তার ছিটেফোঁটার ছাঁটও কি পেতে পারতো না ও? সিগারেটটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে শাহেদ, মুখে
বিস্বাদ লাগছে সবই!
“ভাইয়া আপনি কি শাহেদ?”
হঠাৎ নারীকন্ঠে বাংলা শুনে চমকে ওঠে শাহেদ, তাড়াতাড়ি আড়াল করে বাম হাতে চোখ মোছে।
কখন যেন ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সাদা উইন্টার জ্যাকেট আর নীল ডেনিম ট্রাউজার পরা
মিষ্টি-শ্যামলা চেহারার লম্বা একহারা একটা মেয়ে!
চার
মেয়েটা পিঠে একটা পর্বতসমান ব্যাগ ঝুলিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
“হ্যাঁ, আমি শাহেদ! ...তোমাকে কি আমি চিনি?”
হাসে মেয়েটা, “নাহ! আগে পরিচয় হয়নি। আমার নাম প্রভা। এই সেমিস্টারেই এসেছি বাংলাদেশ
থেকে।”
মেয়েটা যে নতুন এসেছে এটা আগেই অনুমান করেছে শাহেদ। প্রথমত মেয়েটাকে আগে কক্ষনো
দেখেনি। এই ছোট্ট শহরে বাংলাদেশীরা মোটামুটি সবাই সবাইকে ব্যক্তিগত ভাবে না হলেও
চেহারায় চেনে। আর স্থানীয় বাংলাদেশীদের মাঝে নাখ উঁচু হিসেবে নাম আছে ওর। ওরা কখনোই
যেচে পড়ে ওর সাথে কথা বলতে আসবে না।
“কোন ডিপার্টমেন্টে এসেছো?”
“কম্পিইউটার সায়েন্সে। আমি অ্যামাতে ছিলাম। ওখান থেকে ক্রেডিট ট্রান্সফার করে এখানে
থার্ড ইয়ারে এসে ঢুকেছি।”
মেয়েটা কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ে জেনে একটু অবাকই হয় শাহেদ। একটা সময় দেশে কম্পিউটার
সায়েন্সের একটা ক্রেজ উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু এখন সে ক্রেজের পড়ন্ত সময়। গত দুই বছরে
দেশ থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়তে এসেছে এমন বলতে গেলে কাউকেই দেখেনি ও।
“আপনাকে আমি আগেই দেখেছি। সেদিন স্কুলের টিম হর্টনস থেকে কফি নিচ্ছিলেন। তখন জামাল
ভাই আপনাকে দেখিয়ে বললেন আপনিও কমপিউটার সায়েন্সে আছেন। মাস্টার্স করছেন। তবে সেদিন
আপনার মুখ এত গম্ভীর ছিল যে আমি আর কথা বলার সাহস পাইনি।”
ব্বাপরে! মেয়েটার ইতিমধ্যেই জামাল ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়ে গেছে! জামাল ভাই আর ভাবী
দু’জনেই কুৎসা রটানোয় ওস্তাদ। কারো সম্পর্কেই তাঁদেরকে কখনো ভালো কিছু বলতে শুনেনি
শাহেদ। মেয়েটাকে তো তখনই জামাল ভাইয়ের শাহেদ-বিষয়ক জ্ঞান দিয়ে দেয়ার কথা ছিল। ওর
ধারনাকে সত্যি প্রমানিত করতেই যেন প্রভা বলে, “আর জামাল ভাই ঠিক সে মূহুর্তে আপনার
সম্পর্কে অনেক আজে-বাজে কথা বললেন। তাই ভরসা পাইনি! অবশ্য পরে বুঝেছি উনার কোন কথাই
বিশ্বাস করা যায় না। সবার সম্পর্কেই আজেবাজে কথা বলেন কেবল।”
মেয়েটার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায় মুগ্ধ হলো শাহেদ।
“আমি মাত্র ক’দিন হলো এসেছি। আমার সাথে এখানে কারুরই পূর্ব পরিচয় নেই। উনি তবুও
আমাকে নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে অনেক আজেবাজে কথা বলেছেন। আমি নাকি বড়লোকের বখে যাওয়া
মেয়ে। বাংলাদেশে আমাকে সামলাতে না পেরে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন আমার বাবা-মা!”
গালে টোল ফেলে মিষ্টি করে হাসে প্রভা।
সম্ভব! জামাল দম্পত্তির পক্ষে সবই সম্ভব!
“আরে.আপনাকে তো কথাই বলতে দিচ্ছিনা! আমি আসলে অনেক বেশী কথা বলি। সবাই বলে এটা!
এখানে বসি?” অনুমতির তোয়াক্কা না করেই কাঁধের গন্ধমদন ব্যাগটা একপাশে ফেলে, সাবলিল
ভাবে বেঞ্চের বাকিটা তুষার সরিয়ে শাহেদের পাশে বসে পড়ে প্রভা।
“আমার সাথে কেন কথা বলতে চাইছিলে?”
“এমনিতেই ভাইয়া! আমিও কমপিউটার সায়েন্সে আপনিও কমপিউটার সায়েন্সে... একটা ব্যাপার
আছে না?”
একই বিষয়ে পড়ার মধ্যে কি ব্যাপার আছে সেটা পরিষ্কার ভাবে না বুঝেও সায় দিলো শাহেদ।
ওর মনে একটা ক্ষীণ সন্দেহ হচ্ছে, আর কিছু না, ওকে কাঁদতে দেখেই আগ বাড়িয়ে কথা বলতে
এসেছে মেয়েটা। অথচ এখন এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন বিষয়টা ও লক্ষ্যই করেনি! মনে মনে
প্রভার প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করলো শাহেদ।
মেয়েটা অলর্গল কথা বলতে পারে, এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই লাফ
দিতে পারে... আর কথা বলার সময় এমন একটা আবহ তৈরী করে রাখতে পারে যে, যখন যে বিষয়ে
কথা হচ্ছে তখন সে বিষয়টা ছাড়া অন্য কোনো চিন্তাই মাথায় আসে না। মেয়েটার উদ্দেশ্য
যদি থাকে কথা বলে ওর মন ভালো করে দেয়া, তবে বলতে হবে সে কাজটাতে মেয়েটা পূর্ণভাবেই
সফল হয়েছে। মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গিতে এমন একটা শিশুসুলভ সারল্য আছে, যেটা শাহেদের
ভাল লাগছে... একটু আগের সেই মন খারাপ করা ভাবটা নিমিষেই উবে গেছে কর্পূরের মত।
হঠাৎ শব্দে ফিরে তাকায় দু’জনে, মেয়েটার ব্যাগটা বেঞ্চের সাথে হেলান দিয়ে রাখা ছিল,
সেটা সশব্দে উলটে পড়েছে। আঙ্গুল তুলে সেটা দেখায় শাহেদ, “এত বড় ব্যাগ নিয়ে কোত্থেকে
এলে? নাকি যাচ্ছিলে কোথাও?”
“সুপারস্টোরে গিয়েছিলাম। ব্যাগ ভর্তি বাজার। আগামীকাল খিচুড়ি-মাংস রান্না করবো। আজ
সকালে মা’র কাছ থেকে রেসিপি নিয়েছি। শীতের দিনে মজা লাগবে না খিচুড়ি-মাংস? সাথে
বেগুন ভাজা?”
মাথা নেড়ে সায় দিল শাহেদ।
“আমি রান্না জানিনা বললেই চলে। দেশে মাঝে মাঝে শখ করে রান্না করেছি। তাও মা সবসময়
সাথেই থাকতেন। আপনি নিশ্চই এতদিনে ওস্তাদ রাধুঁনী হয়ে গেছেন?”
“আমি রান্না জানিনা!”
“আরে যাহ!” অবিশ্বাসের হাসি হাসে প্রভা, “জানিনা বললেই হলো? খান কি তাহলে?”
“প্রীকুকড খাবার কিনি। আর পাস্তা-ম্যাকরনী-নুডলস-উইংস-পাউরুটি-মাখন-ফল-স্টেকে ভালই
চলে যায়।”
বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে প্রভা, “আপনি ভাত খান না?”
“খাই!” আমতা আমতা করে বলে শাহেদ, “প্রায়ই ইন্ডিয়ান কিংবা চাইনিজ রেস্টোরেন্টে গিয়ে
পেট পুরে ভাত খাই।”
“সেটা আর ক’দিন? মাসে তিনবার, চারবার? আপনি বেঁচে আছেন কিভাবে!”
বোকার মত হাসে শাহেদ।
“শেষ কবে দেশে গেছেন আপনি?”
বুকে রক্ত ছলাৎ করে উঠে শাহীনের, “পাঁচ বছর আগে!”
“ছেলে বলে কি!” আঁতকে ওঠে প্রভা, “এর মাঝে যান নি কেন? কিভাবে পারেন? আমি তো এই
সামনের সামারেই যাব বলে ঠিক করেছি। মাত্র কয়েক হপ্তা গেছে, এরই মধ্যে সবাইকে এত্তো
এত্তো মিস করছি! আপনিও দেশে চলেন না এবার আমার সাথে? আন্টি জানেন আপনি ভাত খান না?”
মাথাটা নিচু করে চোখের পানি আটকাতে চেষ্টা করে শাহেদ। মেয়েটার সামনে আরেকবার কাঁদতে
চায় না ও, “আমার বাবা-মা বেঁচে নেই!”
অদ্ভুত এক নিরবতা নেমে আসে কথাটা বলার সাথে সাথেই। একটু থেমে নিজে থেকেই বলে শাহেদ,
“পাঁচ বছর আগে শেষ যখন দেশে গিয়েছিলাম তখন সেটা তাঁদের সৎকারে...” মৃগী রোগীর মত
সারা শরীরটা কেঁপে কেঁপে ওঠে শাহেদের। মনে হয় মাথাটা শক্ত সাঁড়াশিতে চেপে ধরেছে
কেউ, চেষ্টা করছে বাদামের খোসার মত ভেঙে ফেলতে... ফুসফুসে বাতাস ঢুকেই আটকে যাচ্ছে
বেরুতে পারছে না, পাক খাচ্ছে গত পাঁচ বছরে চেপে রাখা হীণমন্যতার সাথে। চোখ বন্ধ করে
দাঁতে দাঁত চেপে একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে দূষীত কষ্ট গুলো বের করে দেয় শাহেদ, “আমার
বাবা-মাকে ঘুমের মধ্যে গুলি করে মারা হয়েছে। সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলের ৯মিমি
গুলিতে! প্রথমে বাবাকে... এরপর মা!”
খড়খড়ে গলায় হাঁপানী রোগীর মত শ্বাস টানে শাহেদ, “দেশে গিয়ে দেখি বাবা-মা’র মৃত্যুর
বিচারের চেয়ে সম্পত্তি দখলেই বেশী আগ্রহ সবার। আমার রাজাকার সৎ-চাচা আগেই সব দখল
করে রেখেছে, আর বাকিরা সেই নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। খালা-মামারা একটা কেস করেছিলেন। সেই
কেসটাও বাদী-বিবাদী-পুলিশ-শাস্ত্রী সবাইকে টাকা খাইয়ে, না হয় ভয় দেখিয়ে কিভাবে যেন
গায়েব করে দিলো চাচা। সাংবাদিকরা প্রথমে চাচার পেছনে খুব করে লেগেছিলেন। একে তো
রাজাকার, তার উপরে মুক্তিযোদ্ধা ছোট ভাইয়ের খুন! একটা রসালো গল্পের খোরাক ছিল।
সেটাও বন্ধ হয়ে গেল যখন তার কেনা কয়েকজন বাঘা বাঘা সাংবাদিক প্রমান করে দিলেন খুনের
সময় সে দেশেই ছিলো না!”
কাষ্ঠ হাসে শাহেদ, “আর পরিবারের সমর্থনও ছিল চাচার সাথে। দাদার দ্বিতীয় পক্ষ নিয়ে
আগে থেকেই পরিবারে একটা রেশারেশী ছিল...” ওর হাতটা প্রভা শক্ত করে ধরে রেখেছে অনুভব
করে শাহেদ, সেই স্পর্শ্বে সাহস নিয়ে বাকিটা বলে ও, “যেদিন রাত্রে বাবা-মা মারা
গেলেন, ঠিক সে রাতেই তাঁদের সাথে কথা হয়েছে আমার। বাবা গভীর রাতে আমাকে কল দিয়েছেন,
কানাডাতে তখন দুপুর। বাবার সাথে কথা বলে মা ফোন নিয়েছেন। কথার ফাঁকেই উনি বললেন
এইমাত্র তোর বড় চাচা আসলেন! এত রাত্রে এসেছেন, না জানি কি হয়েছে! এখন রাখি, কাল
আবার তোকে কল দেবো।”
“পরদিন আমি কল পেলাম ঠিকই... কিন্তু... সেটা...” শরীরের কাঁপুনি থামানোর বৃথা
চেষ্টা করে শাহেদ, “দেশে গিয়ে আমি কিছুই করতে পারি নি! সব টাকা দিয়ে কিনে রেখেছিলো
চাচা। কোন যুদ্ধে কখনও হারেননি আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবা। তাঁর ছেলে হয়ে কেঁচোর মত
মেরুদ্বন্ড নিয়ে প্রতিদিন নিজেকে আয়নায় দেখি আমি। মাঝে মাঝে মনে হয় যদি হাতে
আগ্নেয়াস্ত্র তুলে নিতে পারতাম... একটা একটা করে বেছে বেছে গুলি করতে পারতাম সব
গুলোকে... কাপুরূষ আমি সেটাও পারিনি!”
প্রভার হাতটা শক্ত মুঠোয় প্রায় ভেঙে ফেলার উপক্রম করেছে বুঝতে পেরে হাতটা ছেড়ে নিতে
চেষ্টা করে শাহেদ, দেয় না প্রভা। আস্তে করে বলে, “বাবা-মা’র শিক্ষা সঠিক ছিলো দেখেই
আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন নি আপনি। এত কিছুর পরেও আপনি নষ্ট হয়ে যাননি
কিন্তু! নিজের চেষ্টায় ব্যাচেলর্স করেছেন, মাস্টার্স করছেন... ঠিক না? টাকা আর
অস্ত্রের ক্ষমতাই কি সব? একদিন আরো বড় হবেন আপনি, আরো ক্ষমতা বাড়বে আপনার। সেদিন
দেশে ফিরে গিয়ে আপনার বাবা-মা হত্যার বিচার আপনি ঠিকই আদায় করে আনবেন। আনবেন না?”
প্রভার অশ্রুসজল চোখে চোখ রেখে দৃপ্ত ভাবে মাথা নাড়ায় শাহেদ।
এক হাতে চোখ মুছে গাড় মমতা নিয়ে বলে প্রভা, “আগে কখনো খিচুড়ি রাঁধিনি বলে বলে হয়তো
ভালো হবেনা... কিন্তু তবুও... আসবেন আপনি?”
পাঁচ
প্রভাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে এক দৌড়ে গিয়ে কেনা সামানগুলো আস্তাকুড়ে ফেলে দিয়ে আসে
শাহেদ।
ছেলেমানুষী যথেষ্ট হয়েছে!